ভারতের পাশ থেকে কেন দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো

 টিআরটি ওয়ার্ল্ডের নিবন্ধ

ভারতের পাশ থেকে কেন দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো

“ভারতের পাশ থেকে কেন দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো”


ভারতের পাশ থেকে কেন দূরে সরে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলো

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ভারত বরাবরই ছিল সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সামরিক শক্তির কারণে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিবেশী দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে গত কয়েক বছরে দৃশ্যপট দ্রুত বদলেছে। বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ প্রায় সব প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কই নতুন দিকের দিকে মোড় নিচ্ছে। এ পরিবর্তনকে অনেকেই “ভারতের প্রভাববলয় থেকে দূরে সরে যাওয়া” হিসেবে দেখছেন।

এ পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু বাস্তব, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক কারণ আছে।


১. একতরফা ও অসম সম্পর্কের অভিজ্ঞতা

দক্ষিণ এশিয়ার অনেক ছোট দেশ মনে করে—ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বহুদিন ধরেই সমান মর্যাদাভিত্তিক নয়।
এখানে ভারতের অবস্থান ছিল ‘বড় ভাই’ বা ‘প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক’, আর ছোট দেশগুলো ছিল নির্ভরশীল।
জলবণ্টন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্য নীতি, ট্রানজিট–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত—অনেক ক্ষেত্রেই ছোট দেশগুলো নিজেকে বঞ্চিত মনে করেছে।

ফলে নতুন প্রজন্মের নাগরিক ও নীতিনির্ধারকরা এখন স্বাধীন ও সম্মানজনক সম্পর্ক চায়।


২. সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রবল ইচ্ছা

প্রতিবেশী দেশগুলো আজ আর ভারতের ছাতার নিচে থাকতে চায় না।
তারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি স্বাধীনভাবে গঠন করতে চায়।
ভারত কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সমালোচিত হয়।
এর ফলে প্রতিবেশী অনেক দেশ তাদের নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে আরও দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে শুরু করেছে।


৩. নতুন শক্তির উদয়—বিকল্প হিসেবে চীন

চীন এখন দক্ষিণ এশিয়ার বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার, বাণিজ্য, ঋণ, বন্দর নির্মাণ—সব ক্ষেত্রে চীন প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে নতুন একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
চীন কাউকে ‘ছোট’ বা ‘নিয়ন্ত্রিত’ হিসেবে দেখে না—এই ধারণাও দেশগুলোকে আকর্ষণ করে।

ফলে ভারত একক প্রভাবশালী শক্তি থেকে ধীরে ধীরে “একাধিক বিকল্পের মাঝে একটি” শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।


৪. জনগণের ভিতর মনোভাবের পরিবর্তন

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এখন জাতীয়তাবাদী অনুভূতি ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাবোধ বেড়েছে।
আগে যেখানে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখানো ছিল রাজনৈতিক সুবিধার অংশ, এখন তা অনেক জায়গায় উল্টো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে।

জনগণ চায় তাদের দেশ নিজের পায়ে দাঁড়াক—এবং বড় দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা না রাখুক। এজন্য সরকারগুলোও নিজেদের নীতি বদলে নিচ্ছে।


৫. অতীতের বিভিন্ন বিতর্ক ও আস্থাহীনতা

সীমান্তে গুলি, নদীর পানি বণ্টন, ট্রানজিট, বাণিজ্যের ভারসাম্যহীনতা—এসব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশীরা অসন্তুষ্ট।
যেখানে ভারতের লাভ বেশি, আর ছোট দেশগুলোর লাভ তুলনামূলক কম—এমন ধারণা বহুদিনের।

এই আস্থাহীনতা জমতে জমতে এখন বাস্তব রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।


৬. আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্য আনার চেষ্টা

আজ আর কেউ এককভাবে ভারতের উপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না।
সব দেশ এখন বহুমাত্রিক সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছে—

  • ভারত

  • চীন

  • মধ্যপ্রাচ্য

  • যুক্তরাষ্ট্র

  • দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

এর উদ্দেশ্য একটাই:
একটি দেশকে অতিরিক্ত ক্ষমতা না দিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা।


৭. নেতৃত্ব পরিবর্তন ও নীতি পরিবর্তন

অনেক দেশের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পররাষ্ট্রনীতিও বদলে যাচ্ছে।
নতুন নেতৃত্বরা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করছে—
সমতা, স্বার্থ ও সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে চাইছে।

এটি ভারতের প্রচলিত প্রভাববলয়কে ধীরে ধীরে সংকুচিত করছে।


উপসংহার

ভারত এখনো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র—এ বাস্তবতায় কোনো সন্দেহ নেই।
কিন্তু নতুন প্রজন্ম, নতুন নেতৃত্ব এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন শক্তির আবির্ভাব—সব মিলিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো এখন নিজেদের স্বার্থকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপন করছে।

তারা ভারতের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হলেও—আসলে তারা স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরস্পর-সমমর্যাদার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

এটাই নতুন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।



Post a Comment

Previous Post Next Post

Blog Archive

kaler khota, কালের কথা, নিউজ, news