গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে যাওয়া শিশু সাজিদকে উদ্ধার

 গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে যাওয়া শিশু সাজিদকে উদ্ধার


গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে যাওয়া শিশু সাজিদ: রাজশাহীর তানোরে টানা উদ্ধার অভিযানের হৃদয়বিদারক গল্প

রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েলহাট পূর্বপাড়া—নামের মতোই শান্ত, নিস্তব্ধ একটি গ্রাম। চারপাশে ধানক্ষেত, কাঁচা রাস্তা, আর দিনের পর দিন কৃষিকাজের ব্যস্ততা। এমনই এক দুপুরে হঠাৎ পুরো এলাকা থমকে যায় যখন মাত্র দু’বছরের শিশু সাজিদ এক পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপে পড়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গ্রামজীবনের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়, শুরু হয় ভয়, কান্না, ছুটোছুটি আর উদ্বেগের দীর্ঘ সময়।

ঘটনার হঠাৎ সূচনা

ঘটনাটি ঘটে দুপুর ১টা নাগাদ। সাজিদ তার মায়ের হাত ধরে মাঠের ধারে হাঁটছিল। বাচ্চাদের মতোই সে মাঝেমধ্যে দৌড়ায়, আবার মাটিতে কিছু তুলে নেয়। ঠিক এমন সময় তার পায়ের নিচে থাকা খড়ের স্তূপটি ভেঙে পড়ে। আসলে খড় দিয়ে ঢাকা ছিল একটি পুরনো, ব্যবহৃত-হীন গভীর নলকূপের গর্ত। বাইরে থেকে কেউই বুঝতে পারতো না নিচে রয়েছে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট বা তারও বেশি গভীর অন্ধকার।

খড়ের ঢাকনা ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই শিশুটি নিচে তলিয়ে যায়। মুহূর্তের ভেতর সাজিদের মুখ থেকে ভেসে আসে উচ্চ চিৎকার—“মা, মা”—এর পরই নিস্তব্ধতা।

গ্রামের মানুষের দৌড়ঝাঁপ

সাজিদের মায়ের হৃদয়বিদারক আর্তচিৎকারে আশেপাশের কৃষক ও গ্রামবাসীরা ছুটে আসে ঘটনাস্থলে। সবাই চেষ্টা শুরু করে গর্তের ভেতর তাকিয়ে কিছু দেখার বা শোনার। কিন্তু ক্ষীণ আলোর নিচে কোনো অবস্থান বোঝা যায় না। গর্তটি এতটাই সরু যে সেখানে একটি মানুষের হাতও অনেক দূর পর্যন্ত নামানো সম্ভব নয়।

কিছু মানুষ দড়ি, বাঁশ বা লাঠি দিয়ে চেষ্টা করে। কেউ কেউ ফোনের আলো দিয়ে নিচে দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু শিশুটির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় না।

তখনই সিদ্ধান্ত হয় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসে খবর দেওয়ার।

উদ্ধার অভিযান শুরু

খবর পেয়ে তানোর ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হয়। পরে রাজশাহী শহর থেকেও অতিরিক্ত টিম আসে। ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বুঝতে পারেন—এটি সাধারণ কোনো উদ্ধার অভিযান নয়। গর্তের মুখ মাত্র ৮ ইঞ্চি ব্যাসের। এমন সরু পাইপে কোনো মানুষ নামতে পারবে না, যন্ত্রপাতি নামানোও অত্যন্ত জটিল।

অক্সিজেন সরবরাহ

শিশুটি যাতে নিঃশ্বাস নিতে পারে—এই আশায় গর্তের মুখে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। পাইপের ভেতর দিয়ে অক্সিজেন পাঠানো হলেও গভীরতার কারণে তা কতটা নিচে পৌঁছাচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ক্যামেরা দিয়ে অনুসন্ধান

ফায়ার সার্ভিস প্রথমে একটি সার্চ ক্যামেরা নিচে নামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গর্তটি বক্র হওয়ায় এবং বেশি সরু হওয়ায় ক্যামেরা খুব বেশি দূর নামানো সম্ভব হয়নি। তবুও কিছুক্ষণের জন্য গর্তের ভেতরে অন্ধকারের মধ্যে নিচে যাওয়ার পথ দেখা যায়, তবে শিশুর কোনো দৃশ্য পাওয়া যায়নি।

মাটি খননের সিদ্ধান্ত

উদ্ধার দল বুঝতে পারে—সরাসরি ওপর থেকে গর্তে ঢুকে শিশুটিকে তোলা সম্ভব নয়। তাই তারা পাশেই মাটি খননের সিদ্ধান্ত নেয়। কয়েকটি এক্সকাভেটর এনে গর্তের পাশেই বড় চেম্বার খোঁড়া শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল গর্তের সমান গভীরতায় পৌঁছে সেখান থেকে একটি পাশ্বর্ীয় সুড়ঙ্গ তৈরি করে শিশুটির কাছে যাওয়া।

এই কাজ অত্যন্ত কঠিন। কারণ—

  • মাটি নরম হলে ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে

  • নিচে শিশুর অবস্থান নিশ্চিত নয়

  • গভীরতা নির্ধারণ করা কঠিন

  • রাতে আলো কম থাকায় কাজ ধীরগতিতে চলতে থাকে

তারপরও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা প্রায় বিরামহীনভাবে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।

মা-বাবার অসহায় অপেক্ষা

সাজিদের মা গর্তের কাছে বসে কাঁদছিলেন। মাঝে মাঝে তার কান্না থামছিল যখন তিনি আশা করছিলেন যে ছেলে হয়তো কোনো শব্দ দেবে। বাবাও ভেঙে পড়েছিলেন, কিন্তু তবুও চেষ্টা করছিলেন নিজেকে সামলাতে।

গ্রামের নারীরা তাঁর পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। গ্রামের পুরুষেরা উদ্ধার টিমকে কাজ করতে সাহায্য করছিল—পানি এনে দিচ্ছিল, আলো জ্বালাতে সহায়তা করছিল, পথ পরিষ্কার করছিল। পুরো গ্রাম এক মুহূর্তে এক হৃদয়ে পরিণত হয়।

২৪ ঘণ্টা পার – এখনও অনিশ্চয়তা

ঘটনার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। উদ্ধারকারীরা ধীরে ধীরে নিচের দিকে টানেল বাড়াতে থাকে। তারা বিভিন্ন সময়ে কাঠ, লোহার রড, দড়ি, ক্যামেরা—সব ব্যবহার করে শিশু কোথায় আছে বুঝতে চেষ্টা করে।

তবে এখনও শিশুটির কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।

৩০ ঘণ্টা – আশার আলো ও আশঙ্কা

সময় যত বাড়তে থাকে, আশঙ্কাও তত গভীর হয়। ফায়ার সার্ভিস জানায়—

  • শিশুটি কোথায় আটকে আছে তা সুনিশ্চিত নয়,

  • গর্তটি সম্ভবত আরও গভীর,

  • ভূগর্ভস্থ মাটির ধরন পরিবর্তন হওয়ায় অনেক জায়গায় টানেল কাটা অসম্ভব হচ্ছে।

তবুও দল নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যেতে থাকে।

গ্রামবাসী রাতে ঘুমায়নি। সবাই মশাল, লাইট, হাতে নিয়ে কাজে সাহায্য করে। অনেকেই দোয়া, কোরআন খতম পড়ছিল শিশুটির নিরাপত্তা কামনায়।

উদ্ধারকর্মীদের চ্যালেঞ্জ

উদ্ধার দলের জন্য এই ঘটনা ছিল কঠিনতম কাজগুলোর একটি।
কারণ—

  • ৮ ইঞ্চি ব্যাসের গর্ত

  • গভীরতা নির্দিষ্ট নয়

  • কোনো স্থানে ক্যামেরা আটকে যাচ্ছে

  • মাটির নিচে ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেখানে শিশুটি কোনোভাবে সরে যেতে পারে

  • পানি বা কাদা থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে

তবুও কেউ হাল ছাড়েনি।

কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটে?

বাংলাদেশে পরিত্যক্ত নলকূপ বা টিউবওয়েল প্রায়ই খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। এগুলোর মুখে সামান্য খড় বা মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যা দ্রুত ঝুঁকির সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি প্রাণঘাতী।

এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো—
✔ পরিত্যক্ত নলকূপ বন্ধ করতে হবে
✔ মুখ সিমেন্ট বা লোহার ঢাকনা দিয়ে সিল করতে হবে
✔ গ্রামের মানুষকে সচেতন করতে হবে
✔ সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন

মানবিকতার বড় উদাহরণ

সাজিদকে উদ্ধারের চেষ্টায় শুধু তানোর বা রাজশাহীর মানুষ নয়—সারা দেশের মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় নজর রাখছিল। সবাই দোয়া করছিল। এটাই মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

শেষকথা

গভীর নলকূপে পড়ে যাওয়া সাজিদের ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি বড় শিক্ষা। প্রতিটি পরিত্যক্ত নলকূপ, প্রতিটি খোলা গভীর গর্ত—যে কোনো মুহূর্তে শিশুর জীবন কেড়ে নিতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের অবিরাম চেষ্টা, গ্রামের মানুষের ঐক্য এবং পরিবারের গভীর কষ্ট—সব মিলিয়ে এই ঘটনাটি মনে রাখার মতো।

উদ্ধার কাজ চলমান, আর সবাই অপেক্ষায়—সাজিদকে যেন খুঁজে পাওয়া যায়, পাওয়া যায় তার জীবনের চিহ্ন।


ইচ্ছা করলে এটিকে শিরোনামসহ নিউজ রিপোর্ট, ভিডিও স্ক্রিপ্ট, বা আরও বড় ফিচার স্টোরিতে রূপান্তর করে দিতে পারি।

Post a Comment

Previous Post Next Post

Blog Archive

kaler khota, কালের কথা, নিউজ, news