রেজা কিবরিয়া মনোনয়ন পাওয়ায় খুশি বিএনপির একাংশ, অসন্তুষ্ট ‘বঞ্চিত’ নেতারা
বিএনপির সর্বশেষ মনোনয়ন তালিকা প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন রেজা কিবরিয়া। ঢাকা ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে দলের একটি অংশ সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও, বিষয়টি সবাই ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেননি। মনোনয়ন প্রক্রিয়া প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে দলের একাংশের মধ্যে দেখা গেছে স্বস্তির আবহ, অন্যদিকে দীর্ঘদিন মাঠে সক্রিয় থাকা বেশ কয়েকজন নেতার মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সুরও শোনা যাচ্ছে।
এই মনোনয়নকে ঘিরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ কীভাবে বদলে গেছে, কেন কিছু নেতার বিরক্তি দেখা দিয়েছে, দলের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এসব প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার মূল কেন্দ্র।
দলের শীর্ষ পর্যায়ে সন্তুষ্টি—রেজা কিবরিয়া ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ’
দলীয় নীতিনির্ধারণী সূত্র জানায়, রেজা কিবরিয়ার মনোনয়ন ছিল বেশ পরিকল্পিত ও কৌশলগত। তাঁকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস চলছে, সেখানে তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখা হচ্ছে। বিএনপির অন্যতম জ্যেষ্ঠ নেতাদের মতে, রেজা কিবরিয়া শুধু দলীয় কাঠামোতেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ও নীতি নির্ধারণী অংশেও সক্রিয়। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক পটভূমি দলকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকৃত করছে।
দলীয় একটি সূত্র বলছে, রেজা কিবরিয়ার বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে দলের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সাহায্য করছে। বিশেষ করে বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি ও নীতিগত বক্তব্য দলের জন্য একটি বাড়তি শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই কারণে মনোনয়ন ঘোষণা হওয়ার পর কেন্দ্রীয় কমিটির একটি বৃহৎ অংশ এটি স্বাগত জানিয়েছে। তাঁরা মনে করছেন, বিএনপির ভবিষ্যৎ নীতি ও কৌশলগত দিকনির্দেশনায় রেজা কিবরিয়া আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন।
তৃণমূল ও স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
যদিও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে রেজা কিবরিয়ার মনোনয়নকে ইতিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে, তৃণমূলে প্রতিক্রিয়া দুই ভাগে বিভক্ত। দলের অনেক তরুণ কর্মী তাঁকে আধুনিক, শিক্ষিত এবং দূরদর্শী রাজনীতির প্রতীক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, দলকে বদলাতে হলে এবং নতুন নেতৃত্ব গঠনে হলে রেজা কিবরিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের দরকার।
তবে বিপরীত চিত্রও স্পষ্ট। স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন দীর্ঘদিনের নিবেদিতপ্রাণ নেতা মনে করছেন, এত বছরের সংগ্রাম ও ত্যাগের পরও যখন তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, তখন এটি তাঁদের প্রতি অবমূল্যায়ন। তাঁদের অভিযোগ, “নতুনদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, অথচ যারা শুরু থেকেই মাঠে ছিল, আন্দোলন-সংগ্রামে ঝুঁকি নিয়েছে, তাদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে।”
এমন মন্তব্যে বোঝা যায়, মাঠ পর্যায়ে বাঁধা-বিপত্তি সত্ত্বেও যারা দলকে ধরে রেখেছে, তারা মনোনয়ন না পাওয়ায় আহত হয়েছেন।
‘বঞ্চিত’ নেতাদের ক্ষোভ—“আন্দোলনে আমরা ছিলাম, মনোনময়ন পেল নতুনরা”
মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই দলের মধ্যে যে নেতারা নিজেদের যোগ্য মনে করতেন, তাঁরা কৌশলগতভাবে সক্রিয় ছিলেন। কেউ কেউ এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন, আবার কেউ দলীয় সভা-সমাবেশে নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। এমন অনেক নেতাই ছিলেন যারা কমপক্ষে আগের কয়েকটি নির্বাচনে দলের প্রার্থী ছিলেন বা ভোটে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সমর্থন পেয়েছিলেন।
তাঁদের অভিযোগ—
-
দলের প্রতি বছরের পর বছর আনুগত্য
-
মামলা-হামলা মোকাবিলা
-
গ্রেফতার-হয়রানি
-
আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা
এসবের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।
একজন নেতার ভাষ্য—
“আমরা যখন রাস্তায় ছিলাম, তখন অনেকেই ছিল না। এখন নির্বাচনে দলের প্রয়োজন দেখে নতুন মুখদের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।”
যদিও এসব বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি, দলীয় আলাপচারিতায় বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে আলোচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তুষ্টি থাকাটা কোনো দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অসন্তোষ না কমলে দলীয় ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মনোনয়ন প্রাপ্তির পেছনে রেজা কিবরিয়ার যোগ্যতা কী?
রেজা কিবরিয়া দলের ভেতরে ও বাইরে নানা কারণে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। তাঁর প্রাপ্ত মনোনয়নকে বিশ্লেষকরা কয়েকটি কারণে যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন—
১. আন্তর্জাতিক যোগাযোগে দক্ষতা
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অংশগ্রহণ করে তিনি দলের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করেছেন।
২. অর্থনৈতিক নীতি ও নির্বাচনী প্রস্তুতিতে ভূমিকা
দলের নির্বাচনী ইশতেহার, অর্থনৈতিক নীতি এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরিতে তিনি সক্রিয়।
৩. প্রজন্মভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরি
বিএনপি যেহেতু নেতৃত্বে নবায়ন আনতে চায়, সেখানে রেজা কিবরিয়াকে একটি আধুনিক, শিক্ষিত ও গঠনমূলক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৪. সাংগঠনিক প্রভাব
দলীয় সিদ্ধান্ত ও আলোচনা পর্বে তাঁর উপস্থিতি দিন দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দলে ‘অসন্তোষ’ বাড়ায় নেতাদের সমন্বয়ে উদ্যোগ
মনোনয়ন ঘোষণার পর যেসব নেতার মধ্যে অসন্তোষ দেখা গেছে, তাদের সমন্বয়ে দলের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতারা চান না যে কোনো ব্যক্তি গণমাধ্যমে নেতিবাচক বক্তব্য দিক বা দলীয় সমাবেশে বিভাজনের ইঙ্গিত তুলে ধরে।
সেই কারণে অসন্তুষ্ট নেতাদের বোঝানোর জন্য দলীয় কয়েকটি সভা-সমন্বয় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দলীয় শীর্ষ নেতারা নীতিগতভাবে বলছেন—
“মনোনয়ন দলীয় কৌশলের অংশ। মাঠের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অসন্তোষের স্থায়িত্ব নির্ভর করবে দলের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও নির্বাচনী প্রস্তুতির ওপর।
ভবিষ্যৎ নির্বাচনে এর কী প্রভাব পড়তে পারে?
মনোনয়ন নিয়ে বিভক্ত প্রতিক্রিয়ার কারণে দলের ভেতরে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে, তার কিছু প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। তবে অনেকেই মনে করেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই দলের নেতারা একক সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে বাধ্য হবেন। কারণ নির্বাচন একটি বড় প্রক্রিয়া এবং দলীয় ঐক্য ছাড়া এটি সফল হওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রেজা কিবরিয়ার মতো প্রার্থী নির্বাচন করলে দল নতুন ভোটার শ্রেণির কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বঞ্চিত নেতাদের সমন্বয় না হলে কিছু এলাকায় কর্মীসংকট তৈরি হতে পারে।
তৃণমূলের প্রত্যাশা—“নেতা যিনিই হোন, ঐক্য চাই”
স্থানীয় পর্যায়ে দেখা গেছে, কর্মীরা অনেক বেশি বাস্তববাদী। তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—
-
দলীয় ঐক্য
-
প্রার্থীর নির্বাচনী সক্ষমতা
-
এলাকায় গ্রহণযোগ্যতা
-
স্থানীয় সমস্যা সমাধানে প্রতিশ্রুতি
যে এলাকায় নেতারা ভুল বোঝাবুঝিতে জড়ান, সেখানে কর্মীদের মনে বিভাজন সৃষ্টি হয়। তবে অনেক কর্মীই বলছেন, “দল যাকে মনোনয়ন দেবে, আমরা তার পক্ষে কাজ করব। আমাদের লক্ষ্য দলকে শক্তিশালী করা।”
উপসংহার
রেজা কিবরিয়ার মনোনয়ন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। একদিকে দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং সক্ষমতা সিদ্ধান্তটিকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কিছু নেতা মনোনয়ন না পেয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছেন, যা দলের ভেতরে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগেই সকল বিভক্তি কমিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নামার প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়ন নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু বিরোধ থাকলেও, বিএনপির সামগ্রিক রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে নেতৃত্ব এখন কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে। সেই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রেজা কিবরিয়া আগামী দিনগুলোতে আরও বড় দায়িত্ব পালন করবেন—এমনটাই দলীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
