খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার পরিকল্পনা: প্রেক্ষাপট, প্রস্তুতি ও সম্ভাবনা—
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া শুধু একটি নাম নন, তিনি দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক আন্দোলন, গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ, ক্ষমতার পালাবদল এবং জাতীয় ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কার্যকাল ও পরবর্তী রাজনৈতিক জীবন নানা মোড়ে আলোচিত-সমালোচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর শারীরিক অসুস্থতা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরিয়ে চিকিৎসার বিছানায় নিয়ে গেছে। আর সেই ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে তাঁকে লন্ডনে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার পরিকল্পনা।
১. প্রেক্ষাপট: কেন লন্ডনে নেওয়ার কথা উঠলো?
বিগত কয়েক বছর ধরে খালেদা জিয়া নানা জটিল রোগে ভুগছেন। মূলত লিভারের সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থ্রাইটিসসহ বহুবিধ সমস্যায় তাঁর অবস্থা দিন দিন জটিল হচ্ছে। এসব রোগ একসাথে থাকায় চিকিৎসা অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। চিকিৎসকরা বারবার বলেছেন—যতক্ষণ পর্যন্ত না সব সমস্যাকে সমন্বিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়া হয়, ততক্ষণ তাঁর অবস্থা স্থায়ীভাবে উন্নত হতে পারে না।
বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তাঁর কিছু সমস্যার জন্য বিদেশে বিশেষায়িত সেন্টারের প্রয়োজন হতে পারে—এমন মত দিয়েছেন বেশ কিছু বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে লিভার ট্রান্সপ্লান্ট মূল্যায়ন, কড্-লিভার ফাংশন টেস্টিং, রক্তক্ষরণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বহুমাত্রিক মেডিকেল কেয়ার—এসবের কিছু সুবিধা বিদেশে তুলনামূলকভাবে বেশি সমন্বিত। এই কারণেই পরিবার তাঁকে লন্ডনে নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে।
২. চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ: যাত্রা সম্ভব কি না
যদিও বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি পরিবার এবং সহযোদ্ধারা জোর দিয়ে আলোচনা করেছেন, তবুও চিকিৎসকদের মূল্যায়ন ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তই নেওয়া সম্ভব নয়। দীর্ঘ ফ্লাইটের ক্ষেত্রে রোগীর শরীর কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বিমানযাত্রায় চারটি গুরুতর ঝুঁকি থাকে—
-
বায়ুচাপ পরিবর্তন
-
অক্সিজেন স্যাচুরেশনের ওঠানামা
-
দীর্ঘসময় একই অবস্থানে থাকায় রক্ত জমাট বাঁধা
-
জরুরি অবস্থায় তাৎক্ষণিক সার্জারি বা আইসিইউ সুবিধার অভাব
এই চারটি বিষয়ের যেকোনো একটি খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে বড় বিপদের কারণ হতে পারে। এ কারণেই চিকিৎসকরা তাঁকে দেশের বাইরে নেওয়ার আগে বেশ কিছু মেডিকেল স্ট্যাবিলাইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। তাঁদের যুক্তি—যদি অবস্থার সামান্য উন্নতি দেখা যায়, তখনই কেবল দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইট বিবেচনা করা যেতে পারে।
৩. পরিবার ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের ভূমিকা
খালেদা জিয়ার পরিবার—বিশেষ করে তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান, যিনি বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন, তিনি চিকিৎসাবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো খুব ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান চিকিৎসক হওয়ায় তিনি মেডিকেল পরামর্শ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন বলেও জানা যায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বিদেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে নিয়মিত অনলাইন মিটিং অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি লন্ডনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালে আগাম মেডিকেল রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে, যাতে তারা রোগীর অবস্থা প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে। বিদেশে ভর্তি প্রক্রিয়া সাধারণত দীর্ঘ, কিন্তু পরিবারের উদ্যোগে দ্রুত ব্যবস্থার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে বিএনপি নেতারা মনে করছেন—উন্নত চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত না হলে তাঁর অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে, যা মানবিকভাবেও কাম্য নয়। তারা বারবার বলছেন—চিকিৎসা কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এটি একটি মানসিক ও মানবিক অধিকার।
৪. লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি: কি কি ব্যবস্থা নিতে হবে
লন্ডনে যাওয়ার প্রস্তুতি অত্যন্ত জটিল এবং ধাপে ধাপে সম্পন্ন করতে হয়। এগুলো হলো—
ক. এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স ব্যবস্থা
এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স সাধারণ বিমানের মতো নয়। এতে থাকে—
-
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (ICU)
-
ভেন্টিলেটর সাপোর্ট
-
মেডিকেল মনিটরিং সিস্টেম
-
জরুরি ওষুধ ও সার্জিক্যাল বক্স
-
দুই বা তিনজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার
এই ধরণের অ্যাম্বুল্যান্স সাধারণত কাতার, সিঙ্গাপুর বা ইউরোপের মেডিকেল সার্ভিস কোম্পানিগুলো পরিচালনা করে। তার খরচও অত্যন্ত বেশি, তবে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি আছে।
খ. কাগজপত্র ও অনুমতি প্রক্রিয়া
যদিও এটি রাজনৈতিক বিষয় নয়, তবুও বিদেশে চিকিৎসার জন্য রোগীর ভ্রমণ-যোগ্যতা সার্টিফিকেট, চিকিৎসা রিপোর্ট, হাসপাতালের স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক ক্লিয়ারেন্স—সবকিছু নিশ্চিত করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভিসা বা বিশেষ মেডিকেল পাস।
গ. হাসপাতাল নির্বাচন
লন্ডনে সাধারণত তিন ধরনের হাসপাতাল বিবেচনা করা হয়—
-
বিশেষায়িত লিভার সেন্টার
-
মাল্টি-ডিসিপ্লিনারি মেডিকেল টিম
-
রিহ্যাবিলিটেশন ও লং-টার্ম কেয়ার ইউনিট
পরিবার এসব জায়গার সঙ্গে আগাম যোগাযোগ করেছে।
৫. বাধা ও চ্যালেঞ্জ
সবকিছু ঠিক থাকলেও যেসব চ্যালেঞ্জ আসতে পারে—
১. শারীরিক দুর্বলতা
চিকিৎসকরা বারবার বলেছেন—অবস্থা উন্নত না হলে বিমানযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ, পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন তাৎক্ষণিক নয়।
২. ফ্লাইটের দীর্ঘ সময়
ঢাকা থেকে লন্ডন যাত্রার সময় ১০–১২ ঘণ্টা। মাঝপথে জরুরি অবস্থা তৈরি হলে সেটি মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে।
৩. চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চিকিৎসকদের মতামত
অবস্থা সামান্য উন্নতি না হলে বিদেশে নেওয়া সম্ভব নয়। চিকিৎসকরাই শেষ সিদ্ধান্ত দেবেন।
৬. সম্ভাব্য সময়রেখা
যদি সবকিছু ঠিকমতো এগোয়, তবে সময়রেখা এমন হতে পারে—
-
স্থানীয় চিকিৎসায় স্থিতিশীলতা পরীক্ষা
-
এয়ার অ্যাম্বুল্যান্স বুকিং
-
হাসপাতাল চূড়ান্ত করা
-
ভ্রমণ ক্লিয়ারেন্স
-
লন্ডনে স্থানান্তর
-
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা শুরু
এই প্রক্রিয়া কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহও লাগতে পারে।
৭. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
যদি তিনি লন্ডনে যেতে সক্ষম হন, তবে চিকিৎসা তিনটি দিকে পরিচালিত হবে—
-
শারীরিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত
-
লিভার ও কিডনি কেন্দ্রিক চিকিৎসা
-
দীর্ঘমেয়াদি রিহ্যাবিলিটেশন
ফিরে আসার বিষয়টি নির্ভর করবে চিকিৎসার অগ্রগতি এবং রোগীর শক্তি ফিরে পাওয়ার ওপর।
উপসংহার
খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নেওয়ার পরিকল্পনা শুধু একটি চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়, এটি তাঁর পরিবার, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, চিকিৎসক এবং দেশের মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। মানবিক দিক বিবেচনায় তাঁর সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তবে তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হওয়ায় বিদেশ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত চিকিৎসকদের বিশ্লেষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং রোগী-স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করছে। সবমিলিয়ে বলা যায়—লন্ডনে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে, প্রস্তুতিও চলছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত পুরোপুরি নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতির ওপর।
