গণভোটে ৪টির বেশি প্রশ্ন রাখার চিন্তা সরকারের
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক ঐক্যের নতুন উদ্যোগে এগোচ্ছে সরকার। আসন্ন জাতীয় গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখার বিষয়ে চলছে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। শুরুতে যেখানে একটি মাত্র প্রশ্ন রাখার কথা ছিল, এখন সেখানে অন্তত চার বা তারও বেশি প্রশ্ন রাখার চিন্তা করছে সরকার। লক্ষ্য—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের মতামত পৃথকভাবে নেওয়া এবং রাজনৈতিক মতভেদের সমাধান খোঁজা।
প্রেক্ষাপট: এক প্রশ্ন থেকে বহু প্রশ্নে যাত্রা
জুলাই জাতীয় সনদের আওতায় গঠিত সংস্কার কমিশন মোট ৮৪টি প্রস্তাব তৈরি করেছে। এর মধ্যে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত প্রস্তাব রয়েছে প্রায় ৪৮টি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনার পর দেখা গেছে, প্রায় ৩০টি বিষয়ে সবার মধ্যে আংশিক বা পূর্ণ একমত হলেও বাকি প্রস্তাবগুলোতে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়েছে।
প্রথমে প্রস্তাব ছিল—গণভোটে শুধু একটি প্রশ্ন থাকবে:
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো অনুমোদন করেন?”
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এত বিস্তৃত প্রশ্নে জনগণের স্পষ্ট মতামত নির্ধারণ কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে বিতর্কিত কিছু বিষয়—যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, বা সংবিধানে নিয়োগপদ্ধতি নির্ধারণ—এসব নিয়ে আলাদা মতামত জানতে চায় সরকার। ফলে এখন আলোচনায় এসেছে একাধিক প্রশ্ন রাখার ধারণা।
সরকারের পরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, আইন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মিলে এ বিষয়ে প্রাথমিক খসড়া তৈরি করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গণভোটের প্রশ্নগুলো তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হতে পারে—
-
সম্মত বিষয়াবলি: যেগুলোতে সব দল একমত, যেমন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা।
-
বিতর্কিত বিষয়াবলি: যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল বা দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন।
-
প্রশাসনিক কাঠামো ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়: সংবিধানে ন্যায়পাল, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সাংবিধানিক পদগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়া স্পষ্ট করার প্রস্তাব।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ থেকে ৫টি পৃথক প্রশ্ন রাখা হতে পারে। প্রতিটি প্রশ্নই থাকবে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তরের উপযোগী করে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই এই গণভোট আয়োজনের প্রাথমিক চিন্তা চলছে, যাতে ভোটাররা একই দিনে ভোট ও গণভোট উভয়ই দিতে পারেন।
উদ্দেশ্য ও যুক্তি
সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, একাধিক প্রশ্ন রাখলে নাগরিকদের মতামত আরও সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হবে। সংবিধান সংশোধন বা নতুন রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে এক প্রশ্নের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ এতে সব বিষয় একত্রে গুলিয়ে যায়।
তাদের যুক্তি, বিভিন্ন দেশের উদাহরণেও দেখা যায়—যখন একটি গণভোটে একাধিক বিষয় থাকে, তখন ভোটারদের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। এতে সরকার বুঝতে পারে কোন প্রস্তাবগুলো জনসমর্থন পাচ্ছে আর কোনগুলো পাচ্ছে না।
তবে সরকারের ভেতরেও কিছু সংশয় রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, বেশি প্রশ্ন রাখলে ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তাই প্রশ্নগুলোকে সরল, স্পষ্ট ও বোধগম্য রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা গণভোটে অংশ নেবে কি না তা নির্ভর করবে প্রশ্নের ধরন ও স্বচ্ছতার ওপর। দলটির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, “সংবিধান সংশোধনের নামে সরকার যদি জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, তাহলে বিএনপি সেই প্রক্রিয়ার অংশ হবে না।”
ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই বলছে, তারা গণভোটে অংশ নিতে আগ্রহী, তবে প্রশ্নগুলোর ভাষা ও উদ্দেশ্য পরিষ্কার হতে হবে। এ ছাড়া তারা দাবি করছে, গণভোটের আগে সব দলের সঙ্গে লিখিত চুক্তি করতে হবে যেন কোনো পক্ষ পরবর্তীতে ফলাফল অগ্রাহ্য না করতে পারে।
বামপন্থি দলগুলো বরং একাধিক প্রশ্ন রাখার পক্ষেই। তাদের মতে, জনগণের মতামত প্রতিটি বিষয়ে আলাদা জানা উচিত। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হবে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, গণভোট আয়োজনের প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। যদি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একত্রে করা হয়, তবে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ব্যালটপেপার রাখা হবে গণভোটের জন্য। ভোটাররা নির্দিষ্ট ঘরে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ চিহ্ন দিয়ে মত প্রকাশ করতে পারবেন।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করতে গেলে বাড়তি কর্মী, নিরাপত্তা ও ভোটার সচেতনতা কর্মসূচি চালাতে হবে বলে জানায় কমিশন। এজন্য অতিরিক্ত বাজেট ও সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণভোট একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হলেও তা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. আবদুল হালিম বলেন,
“একাধিক প্রশ্ন থাকলে ভোটারদের সচেতনতা বাড়ে, কিন্তু প্রশ্নগুলো বুঝতে সহজ হতে হবে। নইলে জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলিত হবে না।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুমানা হক মনে করেন, “সরকার যদি জনমতের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে চায়, তবে এটা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে প্রশ্ন বাছাই করা হলে গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হবে।”
চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি
গণভোটে একাধিক প্রশ্ন রাখার পরিকল্পনায় বেশ কিছু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
-
বোঝাপড়ার সমস্যা: সাধারণ ভোটারদের কাছে জটিল সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা কঠিন হতে পারে।
-
সময়সীমা: একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন করলে ভোটের সময় বাড়াতে হবে এবং গননা প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হবে।
-
রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা: বিরোধী দলগুলো সম্পৃক্ত না থাকলে গণভোটের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে।
-
ব্যয়ের চাপ: অতিরিক্ত ব্যালটপেপার, কর্মী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি অর্থ ব্যয় হবে।
তবে সরকার মনে করছে, এই চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে তা ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর ধরণ
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে নিচের কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রাখার চিন্তা চলছে—
-
স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা ও জেলা পরিষদের ক্ষমতা বৃদ্ধি
-
সংসদের উচ্চকক্ষ (সেনেট) গঠন
-
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল বা বিকল্প নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা
-
সংবিধানে ন্যায়পাল ও নিয়োগ কমিশন সংযোজন
-
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সংরক্ষিত আসনের সময়সীমা
এই প্রশ্নগুলোই চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নির্ভর করছে চলমান রাজনৈতিক আলোচনার ওপর।
সরকারের অবস্থান
সরকারি মুখপাত্ররা বলছেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতই হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সরকারের উদ্দেশ্য কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং জনগণ কী চায়, তা স্পষ্টভাবে জানা।
এক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য বলেন,
“দেশের সংবিধান জনগণের। তাই এর পরিবর্তনেও জনগণের মতামতই প্রধান। আমরা চাই প্রত্যেক নাগরিক যেন নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সরাসরি মত দিতে পারে।”
উপসংহার
গণভোটে চার বা তারও বেশি প্রশ্ন রাখার চিন্তা নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে পারে। জনগণ একসঙ্গে একাধিক বিষয়ে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবে, যা ভবিষ্যতের নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রয়োজন সর্বদলীয় সমঝোতা, স্পষ্ট প্রশ্ন, স্বচ্ছ ভোট আয়োজন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা। অন্যথায় এই গণভোট হয়ে উঠতে পারে আরেকটি রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা।
সবশেষে বলা যায়, সরকারের এই নতুন ভাবনা একদিকে যেমন জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে তা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন উত্তেজনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়—শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের সংখ্যা কত হয় এবং জনগণ কীভাবে সাড়া দেয় সেই ঐতিহাসিক গণভোটে।
