শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড — কোন কোন কারণে রায় এলো
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিচারগুলোর একটি হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়। দীর্ঘ শুনানি, বহু সাক্ষীর জবানবন্দি ও নানান নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত এই রায় ঘোষণা করে। রায়ে তাদের ওপর আরোপিত অভিযোগগুলোকে “মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নিচে সেই অভিযোগ ও কারণগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা হলো।
১. আন্দোলন দমন অভিযানকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধ
ট্রাইব্যুনাল বলেছে, ছাত্র ও তরুণদের আন্দোলন দমনে সরকারের পক্ষ থেকে এমন সব নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সহিংসতার রূপ নেয়।
-
নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো
-
অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার
-
অকারণে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও নিখোঁজের ঘটনা
এগুলোকে আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
২. সরাসরি বা পরোক্ষ নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ
রায় অনুযায়ী, আন্দোলন দমনের সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী ও দলীয় বাহিনীকে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা ছিল দু’জনের।
আদালত বলেছে তাদের অবস্থান ছিল “সুপারভাইসরি কমান্ডে”—ফলে বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায় তাঁরা এড়াতে পারেন না।
বিশেষ করে—
-
কোথায় অভিযান হবে
-
কোন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে
-
কোন এলাকায় কড়া অ্যাকশন নিতে হবে
এসব বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছিল বলে রায়ের ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে।
৩. হত্যাকাণ্ডের দায় ও নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ
বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি নির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আদালতে আলাদাভাবে আলোচিত হয়।
ট্রাইব্যুনালের মতে, এই হত্যাকাণ্ডগুলো ছিল—
-
সংগঠিত
-
উদ্দেশ্যমূলক
-
এবং রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের অংশ
তাই এগুলো “ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি” হিসেবে গণ্য করা হয়।
৪. যথাসময়েই সহিংসতা থামাতে ব্যর্থতা
ট্রাইব্যুনালের মতে, তারা চাইলে সহিংসতা বন্ধ করতে পারতেন, কিন্তু তা করা হয়নি।
এই “ব্যর্থতা” আদালতের কাছে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কারণ তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিলেন এবং নীতিনির্ধারক অবস্থানে থাকার কারণে তাদের দায়িত্ব ছিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা।
৫. উস্কানি ও ভাষণের প্রভাব
আন্দোলনকালে কিছু বক্তব্য ও নির্দেশনাকে আদালত “উত্তেজনা তৈরির উপাদান” হিসেবে বিবেচনা করেছে।
এই উস্কানি সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়েছে—এমন মন্তব্য রায়ের ব্যাখ্যায় এসেছে।
৬. রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার
রায়ে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও সরকারি সম্পদ ব্যবহার করে আন্দোলন দমনকে একটি সমন্বিত প্রচারাভিযানে রূপ দেওয়া হয়েছিল।
যেহেতু এসব পদক্ষেপ ছিল বেসামরিকদের বিরুদ্ধে এবং অতিরিক্ত শক্তির ব্যবহার ছিল অযৌক্তিক—তাই আদালত এটি রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে চিহ্নিত করে।
৭. ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণের নির্দেশ
রায়ের অংশ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এটি দেখায় যে আদালত ঘটনাগুলোকে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা হিসেবে নয়, বরং বেসামরিক মানুষের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে।
সারসংক্ষেপ
শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় এসেছে পাঁচটি মূল কারণে—
১) সহিংস দমন অভিযান,
২) নির্দেশ ও নেতৃত্বের দায়,
৩) হত্যাকাণ্ডে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা,
৪) সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থতা,
৫) উস্কানি ও রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার।
রায়টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে এখনো বহু বিশ্লেষণ চলছে।
