🌍 কোন কোন দেশে মেয়েদের খতনা (FGM) প্রথা রয়েছে — বিস্তারিত বিশ্লেষণ
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও মেয়েদের যৌনাঙ্গ কর্তন বা খতনা করার প্রথা চালু আছে। অনেকে এটিকে ভুলভাবে "মেয়েদের মুসলমানি" বলে থাকেন, কিন্তু চিকিৎসা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে Female Genital Mutilation (FGM) নামে অভিহিত করেছে। এটি মূলত হাজার হাজার বছর পুরোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতি, যার সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রেই নেই, আবার কোথাও ধর্মীয় ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এটি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়।
🌐 কোন কোন দেশে এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
FGM সবচেয়ে বেশি প্রচলিত আফ্রিকা মহাদেশে। এছাড়া কিছু আরব, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকাতেও পাওয়া যায়।
🔸 আফ্রিকার দেশ
| দেশ | প্রচলনের মাত্রা | মন্তব্য |
|---|---|---|
| সোমালিয়া | অত্যন্ত বেশি | অনেক এলাকায় প্রায় সব মেয়েদের করা হয় |
| সুদান | ব্যাপক প্রচলিত | প্রথাগত রূপে কঠোরভাবে পালন |
| মিশর | গ্রামের দিকে দেখা যায় | শহর এলাকায় কমছে |
| ইথিওপিয়া | কিছু উপজাতিতে চর্চা | ধর্মীয় নয়, সাংস্কৃতিক রীতি |
| কেনিয়া | নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীতে | কিকুয়ু ও মাসাই উপজাতিতে বেশি |
| মালি, গাম্বিয়া, গিনি, সিয়েরা লিওন | বহু এলাকায় | দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য |
🔸 মধ্যপ্রাচ্য ও আরব অঞ্চলে
-
ইয়েমেন
-
ওমান এবং আরব উপসাগরের কিছু অংশ
-
ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকা
-
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু উপজাতি
উল্লেখ্য: সব আরব দেশে এটি হয় না। অনেক স্থানে আইন করে নিষিদ্ধও করা হয়েছে।
🔸 দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়
-
ইন্দোনেশিয়া
-
মালয়েশিয়া
-
কিছু অঞ্চলে দক্ষিণ থাইল্যান্ড
এশিয়ায় প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে হালকা কিন্তু প্রতীকীভাবে পালন করা হয়। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটিও নিরাপদ নয়।
✍ কেন এই প্রথা চালু হয়েছে
FGM কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি। ইতিহাস বলছে, এটি এসেছে ধর্ম-পূর্ব যুগের সামাজিক প্রথা থেকে।
প্রধান কারণগুলো—
✔ কুমারীত্ব ও সতীত্ব বজায় রাখার বিশ্বাস
✔ নারী যৌনতা নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা
✔ পরিবার বা সমাজে গ্রহণযোগ্যতার চাপ
✔ বিয়ের উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার শর্ত
✔ পুরোনো আচার-অনুষ্ঠানের অন্ধ অনুসরণ
✔ নারীর শরীরকে ‘পবিত্র’ করার ভ্রান্ত ধারণা
বহু এলাকায় মেয়েদের খতনা না করলে পরিবারকে সামাজিকভাবে অপমানিত হতে হয়—এখনও এমন দৃষ্টান্ত আছে।
📌 ইসলাম এবং অন্যান্য ধর্মে অবস্থান
অনেকেই মনে করেন এটি ইসলামের নিয়ম, কিন্তু—
-
কোরআনে মেয়েদের খতনার কোন নির্দেশ নেই
-
সহীহ হাদিসে বাধ্যতামূলক করার প্রমাণও নেই
-
মুসলিম বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এটি প্রচলিত নয়
অনেক আলেম FGM-কে কুসংস্কার এবং ক্ষতিকর প্রথা হিসাবে দেখেন।
অন্যদিকে আফ্রিকার কিছু সম্প্রদায়ে খ্রিস্টান ও আদিবাসী ধর্মাবলম্বীর মাঝেও এই প্রথা রয়েছে। অর্থাৎ এটি ধর্ম নয়—সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা।
⚠ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও মানসিক ক্ষতি
FGM-এর শারীরিক ক্ষতি হতে পারে—
-
অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ
-
সংক্রমণ, ঘা, সেলাই সমস্যা
-
তীব্র ব্যথা ও স্নায়ু ক্ষতি
-
প্রসবকালীন জটিলতা
-
যৌনজীবনে ব্যথা ও মনস্তাত্ত্বিক ট্রমা
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এটিকে নারীর শরীর ও স্বাধীনতার ওপর সহিংসতা বলে উল্লেখ করে।
🔥 আধুনিক বিশ্বে অবস্থান ও আইন
বর্তমানে ৪০টিরও বেশি রাষ্ট্র—FGM-কে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
আফ্রিকা, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ আইন করে এই প্রথা বন্ধ করছে। জাতিসংঘ, WHO, ইউনিসেফ এবং নারীর অধিকার সংগঠনগুলো বিশ্বব্যাপী মানুষকে সচেতন করছে।
অনেক দেশে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে—
✔ তরুণ প্রজন্মের বিরোধিতা
✔ শিক্ষার বিস্তারের ফলে প্রথা হ্রাস
✔ আইনি নজরদারি ও শাস্তির বিধান
✔ সচেতনতার ফলে পরিবারগুলো বিরত হচ্ছে
তবুও কিছু এলাকায় প্রথাটি এখনো টিকে আছে, প্রধানত অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং সামাজিক চাপে।
🔎 উপসংহার
মেয়েদের খতনা বা FGM কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়—এটি একটি গোঁড়ামি নির্ভর ঐতিহ্য। আফ্রিকার বেশ কিছু দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের সীমিত অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রথা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা ও মানবাধিকার দৃষ্টিতে এটি ক্ষতিকর, অমানবিক এবং ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তির পথে।
