ডিসি নিয়োগে কঠোর অবস্থানে থাকতে পারেনি সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি বলে জানা গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ, বদলি ও বাতিলের ঘটনায় প্রশাসনের ভেতরে নানামুখী আলোচনা তৈরি হয়েছে। যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রাধান্য পেয়েছে—এমন মন্তব্য করছেন প্রশাসনিক মহলের অনেকে।
প্রেক্ষাপট
জেলা প্রশাসক দেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর একটি। জেলা পর্যায়ে সরকারের নির্বাহী প্রতিনিধি হিসেবে ডিসির দায়িত্ব হলো প্রশাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নির্বাচন তদারকি ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন। ফলে এই পদে নিয়োগে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক মাসে সরকার ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। অনেক জেলা প্রশাসককে হঠাৎ বদলি করা হয়েছে, আবার কয়েকজনের নিয়োগ বাতিলও করা হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ধারণা, এই ঘন ঘন পরিবর্তন সরকারের ভিতরে সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রভাব খাটানোর প্রবণতার প্রতিফলন।
নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ
প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক নিয়োগে সিনিয়রিটির চেয়ে অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্য ও ব্যক্তিগত পরিচিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কিছু কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, যোগ্য হলেও রাজনৈতিকভাবে ‘নিরপেক্ষ’ হওয়ায় অনেককে পদোন্নতির বাইরে রাখা হয়েছে।
এছাড়া কিছু জেলায় যেসব কর্মকর্তা আগে সরকারি দল বা স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, তাদেরই ডিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
একজন সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“সরকার শুরুতে বলেছিল যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে ডিসি নিয়োগ হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই সেই নীতি মানা হয়নি। ফলে প্রশাসনের ভেতরে হতাশা তৈরি হয়েছে।”
সরকার কেন কঠোর থাকতে পারেনি
সরকারের ভিতরে থাকা একাধিক সূত্র জানায়, ডিসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়, স্থানীয় রাজনীতি, সংসদ সদস্যদের চাপ এবং দলীয় সুপারিশ—সব মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল হয়ে পড়েছে।
প্রথমে প্রশাসন মন্ত্রণালয় কিছু কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করলেও, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে সেই তালিকা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিছু নিয়োগের পর দ্রুত আবার তা বাতিল বা বদলি করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, সরকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারেনি।
এমন পরিস্থিতিতে একটি অংশ মনে করছে, সরকার নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্ত করতে চাইছে, আর অন্য অংশ চায় দক্ষ ও জনপ্রিয় কর্মকর্তাদের পদে বসানো হোক। এই টানাপোড়েনে “কঠোর অবস্থান” বাস্তবে দুর্বল হয়ে গেছে।
প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ
প্রশাসনের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে, অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা, সংসদ সদস্য বা ব্যবসায়িক গোষ্ঠী নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে সুপারিশ করেন। কেউ কেউ আবার নিজেদের অনুগত কর্মকর্তা বসানোর চেষ্টা করেন, যাতে জেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
ফলে একদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় স্বচ্ছ নিয়োগের কথা বললেও মাঠপর্যায়ে সেই নীতি কার্যকর হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়কে ‘সমঝোতা’ করতে হচ্ছে, যাতে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের অসন্তোষ না হয়।
প্রশাসনিক অস্থিরতা ও সমালোচনা
ডিসি নিয়োগে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে অনেক জেলার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্বে যোগ দিয়েই কিছুদিন পর আবার বদলি হচ্ছেন, ফলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
এছাড়া, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে—কখন কোথায় বদলি হতে হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারছেন না।
একজন প্রাক্তন জেলা প্রশাসক মন্তব্য করেন,
“যখনই প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে যায়, তখন যোগ্য কর্মকর্তারা পিছিয়ে পড়েন। এতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জনগণের আস্থা কমে যায়।”
বিরোধী দলের প্রতিক্রিয়া
বিরোধী দলগুলো বলছে, সরকার নির্বাচনের আগে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তা বসাতে চাইছে, যাতে মাঠপর্যায়ে প্রভাব বজায় রাখা যায়। বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী জোটের মতে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তারা দাবি করেছে, ডিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের ব্যাখ্যা
সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, সব নিয়োগই নিয়ম মেনে হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। সরকারের এক মুখপাত্র বলেন,
“নিয়োগে কোনো দলীয় প্রভাব নেই। যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। যোগ্যতার ভিত্তিতেই পদায়ন করা হয়েছে।”
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নিয়োগ-বদলির সংখ্যাই এখন এত বেশি যে, প্রশাসনের ভেতরে একধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতাই সরকারের “কঠোর অবস্থান” প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার যদি সত্যিই নিরপেক্ষ ও দক্ষ প্রশাসন গঠন করতে চায়, তবে ডিসি নিয়োগে কঠোর নীতি ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
তাদের মতে, জেলা প্রশাসক পদে রাজনৈতিক প্রভাব ঢুকে পড়লে পুরো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মেধাবী কর্মকর্তারা মনোবল হারান, আর অনুগতরা পুরস্কৃত হন।
একজন প্রশাসন বিশেষজ্ঞ বলেন,
“যদি সরকার কঠোর নীতিতে অটল থাকতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে প্রশাসনের উপর জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে। নির্বাচনের আগে এমন নিয়োগকে অনেকে রাজনৈতিক প্রস্তুতি হিসেবেও দেখবে।”
সম্ভাব্য পরিণতি
বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি সরকার ডিসি নিয়োগে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মানদণ্ড পুনঃনির্ধারণ না করে, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থায়।
-
প্রথমত, মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা হ্রাস পাবে।
-
দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা তৈরি হবে।
-
তৃতীয়ত, জনগণের আস্থা ও নিরপেক্ষ প্রশাসনের ধারণা ক্ষুণ্ন হবে।
-
চতুর্থত, নির্বাচনের সময় প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, জেলা প্রশাসক নিয়োগে সরকার ঘোষিত কঠোর নীতিতে পুরোপুরি অটল থাকতে পারেনি। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণে প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল হয়নি।
যদিও সরকার বলছে তারা যোগ্য কর্মকর্তাদেরই বেছে নিচ্ছে, বাস্তব চিত্র বলছে অন্য কথা—যেখানে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি মূল্য পাচ্ছে।
প্রশাসনের ভেতরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই প্রয়োজন একটি স্পষ্ট ও কঠোর নীতিমালা, যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতা হবে একমাত্র মানদণ্ড। অন্যথায়, ডিসি নিয়োগ ঘিরে এই বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক কার্যকারিতা ও জনগণের আস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
