পাকিস্তানে বিতর্কিত সংস্কার: সামরিক ভারসাম্য শক্তিশালী করবে, নাকি আরও টালমাটাল করবে?
পাকিস্তানে সাম্প্রতিক যে সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। নতুন সংস্কারে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি, সশস্ত্র বাহিনীর কাঠামো পুনর্গঠন, এবং বিচার বিভাগের ওপর সরকারের প্রভাব বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব পরিবর্তন পাকিস্তানের সামরিক ভারসাম্যকে কতটা শক্তিশালী করবে, আর কতটা অস্থির করে তুলতে পারে—এই নিয়ে এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতবিরোধ তুঙ্গে।
নিচে বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
১. সংস্কারের মূল বিষয়গুলি কী?
-
সামরিক বাহিনীর তিনটি শাখার ওপর একটি সমন্বিত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোতে সেনাপ্রধান আরও বিস্তৃত ক্ষমতা পাচ্ছেন।
-
প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সিভিল প্রশাসনের ভূমিকা কিছুটা কমে গিয়ে সেনা নেতৃত্বের কর্তৃত্ব বাড়ছে।
-
বিচার বিভাগের কাঠামোতেও পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব এসেছে, যা সমালোচকদের মতে সামরিক-সরকারি জোটের হাতে আরও নিয়ন্ত্রণ যোগ করবে।
-
জাতীয় নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে “সামরিক অবস্থানকে প্রধান বিবেচ্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এসব পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২. সামরিক ভারসাম্যকে কীভাবে শক্তিশালী করতে পারে?
ক. সমন্বিত ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ
সামরিক বাহিনীর ভেতরে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ফলে সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে। যুদ্ধ, সীমান্ত উত্তেজনা বা সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে দেরি কমবে।
খ. দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা সহজ হবে
শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকলে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, কৌশলগত বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। পাকিস্তানের বর্তমান ভৌগোলিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবেশে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
গ. বাহিনী পরিচালনায় ঐক্য ও শৃঙ্খলা বৃদ্ধি
পৃথক শাখার আলাদা আলাদা চাপ বা প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে কমান্ড চেইন আরও পরিষ্কার হতে পারে। এতে সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়ে।
ঘ. জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে দৃঢ়তা
পাশাপাশি থাকা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় পাকিস্তান হয়তো মনে করছে—একটি শক্ত হাতে পরিচালিত সামরিক কাঠামো তাদের পক্ষে কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে।
৩. তবে কি এই সংস্কার ঝুঁকিপূর্ণ?
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই পরিবর্তনে সুযোগের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গুরুতর অস্থিরতার ঝুঁকিও লুকিয়ে আছে।
ক. গণতন্ত্র ও সিভিল প্রশাসনের ওপর প্রভাব
যখন সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও উপরে উঠে আসে, তখন নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে সিস্টেমে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
খ. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
এক ব্যক্তির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতার অপব্যবহার বা অহংকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেখানে রাজনৈতিক খোলামেলাতা কম, সেখানে এ ঝুঁকি আরও বড়।
গ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
বিচার বিভাগের ক্ষমতা কমে গেলে ন্যায়বিচারের পরিবেশ দুর্বল হতে পারে। আইনকে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হলে দেশ আরও অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।
ঘ. সামরিক-রাজনৈতিক ঘর্ষণ বাড়তে পারে
ইতিহাস বলছে, পাকিস্তানে যখন সেনাবাহিনী রাজনীতিতে বেশি শক্তিশালী হয়, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঘর্ষণ বৃদ্ধি পায়, এবং রাষ্ট্র কাঠামোয় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
ঙ. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর চাপ
বিদেশি সহযোগী রাষ্ট্রগুলো গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতা প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
৪. সার্বিক মূল্যায়ন
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংস্কার দেশটির সামরিক বাহিনীকে সংগঠিত, শক্তিশালী ও দ্রুতগামী করার সম্ভাবনা তৈরি করছে—এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যকে সামরিক দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণতান্ত্রিক দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার কারণ হতে পারে।
অর্থাৎ, এই সংস্কার পাকিস্তানের সামরিক ক্ষমতা বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে আরও নাজুকও করে দিতে পারে।
