মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা
যে সাক্ষ্যে বেরিয়ে আসে হাসিনার অন্দরের অজানা সবকিছু
মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা: যে সাক্ষ্যে উঠে আসে হাসিনা সরকারের অন্তরালের অজানা দিকগুলি
বিশদ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বিচারপ্রক্রিয়াগুলোর একটি হলো ২০২৪ সালের আন্দোলন–পরবর্তী দমনপীড়নকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলা। এই মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক পুলিশপ্রধানকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের ওপর সুসংগঠিতভাবে দমন, হামলা, নির্যাতন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
যদিও মামলার রায় এখনও ঘোষিত হয়নি, তবে আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য, অডিও প্রমাণ, সিডিআর, রাজসাক্ষীর জবানবন্দি, এবং তদন্ত কর্মকর্তার বিবরণ—সব মিলিয়ে উঠে এসেছে তৎকালীন ক্ষমতার ভেতরের বেশ কিছু অজানা ঘটনা ও অভ্যন্তরীণ অবস্থা।
১. মামলার ভিত্তি: আন্দোলনের সময়ের দমন-পীড়ন
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সারাদেশে ব্যাপক ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। আন্দোলন চলাকালে বহু স্থানে সংঘর্ষ, গুলি, আটক এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
ইন্টারিম সরকার ক্ষমতায় আসার পর এসব ঘটনার ওপর তদন্ত শুরু করে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ—
-
দমন-পীড়ন ছিল পরিকল্পিত,
-
উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া এমন অভিযান সম্ভব নয়,
-
এবং এটি “সামষ্টিক আক্রমণ” এর পর্যায়ে পড়ে।
২. আদালতে সাক্ষ্য: যা যা উঠে এসেছে
মামলায় পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ ৪০ জনের বেশি সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব সাক্ষ্যে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তার কয়েকটি দিক গুরুত্বপূর্ণ—
ক) পরিকল্পিত অভিযানের অভিযোগ
অনেক সাক্ষী বলেছেন—
অভিযানের ধরন এবং নির্দেশের ধরণ দেখে মনে হয়েছে এটি ছিল হঠাৎ প্রতিক্রিয়া নয় বরং পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা।
খ) কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত
কিছু সাক্ষ্য অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা দাবি করেছেন—
-
তাদের “উপর থেকে” কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল,
-
বারবার নির্দেশের কথিত উৎস ছিল “উচ্চপর্যায়ের বৈঠক”,
-
কিছু কিছু সময়ে নেমে আসা আদেশ ছিল “অবিলম্বে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনো—যেভাবেই হোক।”
যদিও সাক্ষীরা স্পষ্টভাবে কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেননি, তবে রাষ্ট্রপক্ষ এসব নির্দেশের উৎস খুঁজে দেখার চেষ্টা করেছে।
৩. প্রমাণ হিসেবে অডিও ক্লিপ ও সিডিআর
তদন্তকারী সংস্থা আদালতে ৬৯টি অডিও ক্লিপ এবং ৩টি সিডিআর (কল রেকর্ড) দাখিল করে।
এই অডিওগুলো সম্পর্কে রাষ্ট্রপক্ষের দাবি—
-
কিছু ফোনালাপে অভিযানের ধরন নিয়ে আলোচনা পাওয়া গেছে,
-
কয়েকটি রেকর্ডে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে,
-
এবং সিডিআর দেখায় কে কোন সময়ে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
তবে আদালত এখনও এসব প্রমাণ বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য কি না সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
৪. রাজসাক্ষীর জবানবন্দি: সবচেয়ে আলোড়ন তোলা অংশ
মামলার অন্যতম আসামি সাবেক আইজিপিকে রাষ্ট্রপক্ষ রাজসাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করে।
তার বক্তব্যে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে বলে জানা যায়—
-
আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে “চাপ” ছিল,
-
বিভিন্ন সময় ‘কঠোর ব্যবস্থা নাও’ এমন বার্তা এসেছে,
-
মাঠ পর্যায়ের বাহিনীকে দ্রুত অভিযানে যেতে বলা হয়েছিল।
তার এই জবানবন্দি মামলার গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
৫. তদন্ত কর্মকর্তার বিবরণ
তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে বলেন—
-
পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ পাওয়া গেছে,
-
নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তালিকা যাচাই করা হয়েছে,
-
অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য, মোবাইল রেকর্ড এবং ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে—একটি নির্দিষ্ট সময়-পরিসরে অনেকগুলো স্থানে একই ধরনের অভিযান চালানো হয়, যা একে আকস্মিক নয়—সমন্বিত বলে মনে হয়।
৬. আসামিপক্ষের দাবি: এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা
শেখ হাসিনা তার এক সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন—
-
মামলা রাজনৈতিক প্রতিশোধ থেকে করা হয়েছে,
-
বিচার প্রক্রিয়া পক্ষপাতিত্বপূর্ণ,
-
এবং দেয়া সাক্ষ্যগুলো বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তার আইনজীবী দল বলছে—
-
অডিওগুলোর সত্যতা যাচাই হয়নি,
-
সিডিআর আংশিক তথ্য,
-
আর রাজসাক্ষীর বক্তব্য চাপের মুখে নেওয়া হয়েছে।
৭. আদালতের অবস্থা: রায় এখনো বাকি
সব সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হলেও এখনো চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়নি।
-
আদালত বলেছে প্রমাণ বিশ্লেষণ চলছে,
-
প্রতিটি বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে,
-
এবং বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত নয়।
উপসংহার
এই মামলায় সাক্ষ্য, প্রমাণ ও জবানবন্দি মিলিয়ে উঠে এসেছে তৎকালীন সরকার পরিচালনার অন্তরালের নানা অজানা দিক—সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, নির্দেশের উৎস, নিয়ন্ত্রণের ধরণ এবং অভিযানের সমন্বয় নিয়ে নানা তথ্য।
তবে—
-
এসব অভিযোগ এখনও প্রমাণিত নয়,
-
আদালত চূড়ান্ত রায় না দেওয়া পর্যন্ত কোনোকিছুই সিদ্ধান্ত হিসেবে ধরা যাবে না।
তারপরও, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলার ভেতরের চিত্র জনগণের সামনে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে—আর সেখানেই উঠে আসছে ক্ষমতার ভেতরের কিছু অজানা অধ্যায়, যা বহুদিন গোপনে ছিল।
