ইসরায়েলের গোপন কারাগার ‘রাকেফেত’: যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না কখনো
ইসরায়েলের ইতিহাসে “রাকেফেত” নামটি এক রহস্যে ঘেরা অন্ধকার অধ্যায়। সাধারণ নাগরিক তো বটেই, অনেক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছেও এই কারাগার এক ধোঁয়াশার মতো। এটি এমন এক গোপন কারাগার, যেখানে বন্দিদের নাম, পরিচয় কিংবা তাদের অপরাধের প্রকৃতি—কোনো কিছুই প্রকাশ করা হয় না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, বলা হয় এই কারাগারে কখনো সূর্যের আলো পৌঁছায় না।
🔒 রহস্যের সূচনা
ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেত (Shin Bet) এবং মোসাদ দীর্ঘদিন ধরেই গোপন আটক কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে বলে অভিযোগ আছে। তবে “রাকেফেত” (Rakefet Prison বা Facility 1391) নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক আলোচনা শুরু হয় ২০০৩ সালে, যখন কিছু মানবাধিকার সংগঠন ও প্রাক্তন বন্দি এটি সম্পর্কে কথা বলতে শুরু করেন।
তাদের দাবি অনুযায়ী, এটি ইসরায়েলের কোনো জনবসতি থেকে অনেক দূরে, এমন এক সামরিক ঘাঁটির ভেতরে অবস্থিত যেখানে কোনো মানচিত্রেও চিহ্ন নেই। গুগল আর্থে এটি “ব্লার” করে দেওয়া—অর্থাৎ জনসাধারণ যেন সেটি দেখতে না পারে।
🕳 কারাগারের ভেতরের নরক
বলা হয়, রাকেফেত কারাগারে বন্দিদের রাখা হয় সম্পূর্ণ অন্ধকার কক্ষে। কোনো জানালা নেই, নেই আলো বা বাতাস চলাচলের সুযোগ। দিনের কোন সময় চলছে—বন্দিরা তা পর্যন্ত বুঝতে পারে না।
একজন সাবেক ফিলিস্তিনি বন্দি বর্ণনা করেছিলেন,
“ওরা আমাদের চোখে কাপড় বেঁধে নিয়ে যেত। ঘরের ভেতর পা রাখার পর থেকে আর কোনো আলো দেখিনি। শুধু এক টুকরো বিছানা, আর দেওয়ালের ভেতর থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস।”
এমন পরিবেশে বন্দিদের মানসিক ভেঙে পড়া, দিশেহারা হয়ে পড়া এবং ‘স্বীকারোক্তি আদায়’-এর জন্য ভয়াবহ মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
⚖️ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
২০০৩ সালে Amnesty International এবং Human Rights Watch উভয় সংস্থা এই কারাগার নিয়ে তদন্তের দাবি জানায়। তাদের মতে, রাকেফেত হলো এমন একটি স্থাপনা যেখানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন—বিশেষ করে Geneva Convention—এর ধারা বারবার লঙ্ঘিত হয়।
বন্দিদের অনেক সময় “নিখোঁজ” হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরিবার জানতে পারে না তারা জীবিত না মৃত। আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ নেই, আদালতে হাজিরাও নয়—এ যেন এক আইনের বাইরের পৃথিবী।
🧱 অবস্থান ও গোপনীয়তা
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই কারাগারের অবস্থান প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি সম্ভবত উত্তর ইসরায়েলের হাইফা অঞ্চলের কাছে, একটি পুরনো ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটির ভেতরে অবস্থিত।
ইসরায়েলের সরকার বরাবরই দাবি করে এসেছে, “Facility 1391” জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয় এবং সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি।
🧩 রাকেফেত: শুধু কারাগার নয়, মানসিক অস্ত্র
বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাকেফেত কেবল বন্দিশালা নয়—এটি এক ধরনের “মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র”। এর অস্তিত্বই বন্দিদের মনে ভয় জাগিয়ে তোলে। অনেকে বলে থাকেন, এটি ইসরায়েলের “অদৃশ্য শাস্তি ব্যবস্থা”—যেখানে মানুষ আইনের বাইরে গিয়ে শাস্তি পায়, কিন্তু কোনো কাগজে তার নাম থাকে না।
🌑 সূর্যের আলোহীন নরক
‘যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না’—এই বাক্যটি শুধু উপমা নয়, বরং বাস্তব বর্ণনা। কারাগারের দেয়ালগুলো এমনভাবে তৈরি যে, কোনো প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করতে পারে না। বন্দিরা সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, রাত-দিন একাকার হয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এমন পরিবেশে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের সত্তা হারিয়ে ফেলে, বিভ্রমে ভোগে, এবং অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একে বলা হয় “sensory deprivation torture”, যা আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ।
🕊 আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বহুবার ইসরায়েলকে Facility 1391 বা রাকেফেত নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে। তবে ইসরায়েল কখনোই সরাসরি এর অস্তিত্ব স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। তারা এটিকে “জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়” বলে পাশ কাটিয়ে যায়।
এমনকি কিছু সাংবাদিক যখন সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন, তখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাদের আটক করে ফেরত পাঠায়। ফলে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়।
📜 উপসংহার
রাকেফেত কারাগার ইসরায়েলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অন্ধকার অধ্যায়। এখানে সূর্যের আলো যেমন পৌঁছায় না, তেমনি পৌঁছায় না বিচার বা ন্যায়ের আলোও। আধুনিক যুগেও পৃথিবীর এমন এক জায়গা আছে, যেখানে মানুষকে “অদৃশ্য বন্দি” বানিয়ে রাখা হয়—এটাই রাকেফেতের ভয়াবহ বাস্তবতা।
মানবাধিকারের নামে সভ্যতার যত অগ্রগতি হয়েছে, রাকেফেতের মতো স্থানগুলো তার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে—একটি প্রমাণ হিসেবে, যে এখনো অন্ধকারের রাজত্ব পুরোপুরি শেষ হয়নি।
