বিডিআর হত্যাকাণ্ড: কমিশনের রিপোর্টে আ.লীগের সংশ্লিষ্টতার দাবি ও তাপসকে মূল সমন্বয়কারী হিসেবে উল্লেখ—এক বিশ্লেষণ
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারির সেই ভয়াল সকালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম বেদনাবিধুর দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। পিলখানার বিডিআর সদর দফতরে রক্তাক্ত বিদ্রোহের ঘটনায় নিহত হন বহু সেনা কর্মকর্তা—যাদের বেশিরভাগই ছিলেন শান্তিকালীন পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত। এই ঘটনাকে শুধু বিদ্রোহ বলা হয় না; অনেক বিশ্লেষক মনে করেন এটি ছিল একটি সুসংগঠিত হত্যাযজ্ঞ, যার লক্ষ্য ছিল সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করে দেওয়া।
দীর্ঘ প্রায় একযুগ পর গঠিত জাতীয় তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত অনুসন্ধান জমা দেয়, যেখানে ঘটনার স্বরূপ নিয়ে নতুন এক ব্যাখ্যা সামনে আসে। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড হঠাৎ আবেগের ফল নয়, বরং একটি দীর্ঘ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়—ঘটনায় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার চিহ্ন রয়েছে এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে দলগতভাবে জড়িত পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এটিই এই তদন্তের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অংশ।
কমিশনের নথিতে বলা হয়, পরিকল্পনার সমন্বয় ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে নাম আসে তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস—তাকে কমিশন “মূল সমন্বয়কারী” হিসেবে চিহ্নিত করে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষের ভিড়ের আড়ালে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত একটি দল ঢুকেছিল এবং বিদ্রোহের উত্তেজনা ও হত্যাকাণ্ডকে আরও ভয়াবহ করে তোলে বলে ধারণা করা হয়। কমিশন বলে যে প্রাথমিকভাবে সংখ্যা ছিল সীমিত, কিন্তু পরে সেটি কয়েক গুণ বেড়ে যায়—যা হঠাৎ অপ্রস্তুত সংঘটন নয়, বরং উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—কমিশন যাদের সম্পৃক্ততার কথা বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত রায় বা বিচার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলেও বিচারিক প্রমাণ পেশ, সাক্ষী পরীক্ষা, অপরাধ নিশ্চিতকরণ—এসব প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ নয়। অর্থাৎ, রিপোর্টে নাম আসা মানেই আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়; বরং এটি বিচারার্থে একটি নির্দেশনামূলক দলিল।
কমিশন আরও জানায়—বিদ্রোহ শুধু অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ থেকে জন্মায়নি; বহিঃশক্তি বা বিদেশি প্রভাবও থাকতে পারে। যদিও তাদের পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে ভবিষ্যৎ তদন্ত এগুলো উন্মোচনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশা করা হয়। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, গোয়েন্দা ত্রুটি, সেনা-আনা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত—এসবকেও বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন একটি রিপোর্ট অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে। জনগণ জানতে চায়—যদি সত্যিই রাজনৈতিক সমন্বয়ে হত্যাকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে, তবে এত বছর বিচার বিলম্বিত হলো কেন? কারা উপকৃত হল? সেনা ব্যবস্থার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী ছিল? আবার যারা অভিযুক্ত, তারাও বলে আসছে—এগুলি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ, প্রমাণিত সত্য নয়। সুতরাং ভবিষ্যৎ বিচারই নির্ধারণ করবে ইতিহাস কোন মুখে স্মরণ করবে এই দিনকে।
এখন প্রয়োজন স্বচ্ছ বিচার, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য যাচাই এবং সত্য উন্মোচনের রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। কারণ সত্য ইতিহাসকে অনন্তকাল আটকে রাখা যায় না।
