নাশকতাকারীদের গুলির নির্দেশ ডিএমপি কমিশনারের

ডিএমপি কমিশনারের গুলির নির্দেশ: ট্রাইব্যুনালে একের পর এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য



ডিএমপি কমিশনারের গুলির নির্দেশ: ট্রাইব্যুনালে একের পর এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তৎকালীন কমিশনারের দেওয়া “গুলির নির্দেশ” এখন মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। আদালতে একের পর এক সাক্ষ্য উপস্থাপিত হচ্ছে, আর সেসব সাক্ষ্য থেকে উঠে আসছে ২০২৪ সালের আন্দোলন দমনের সময়কার অন্তরালের কঠোর নির্দেশ, অপারেশন পদ্ধতি এবং গোপন যোগাযোগের বিবরণ।


সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ—সাক্ষ্যে নিশ্চিত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া মামলায় পুলিশ সদস্য, ওয়ারলেস অপারেটর ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য থেকে জানা গেছে—
২০২৪ সালের ১৭ জুলাই বিকেলে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান বেতার বার্তায় “সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ” করার নির্দেশ দেন।

সাক্ষীরা জানান, কমিশনারের নির্দেশ ছিল সরাসরি, স্পষ্ট এবং কোনো বিকল্প ছাড়াই কার্যকর করতে বলা হয়েছিল।

বেতার নেটওয়ার্কে দেওয়া নির্দেশে উল্লেখ ছিল—

  • চায়নিজ রাইফেল প্রস্তুত রাখতে,

  • পরিস্থিতি “যেকোনোভাবে” নিয়ন্ত্রণে আনতে,

  • এবং প্রয়োজন হলে গুলি চালাতে।

ওয়ারলেস অপারেটররা জানান, সেই বার্তা পরপর কয়েকটি ইউনিটে পাঠানো হয় যাতে মাঠপর্যায়ে থাকা সব বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ বুঝে যায়।


“হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করুন”—সাক্ষ্য আরও চাঞ্চল্যকর

এক পুলিশের এসআই আদালতে বলেন—
কমিশনার বার্তা দেন, “হাঁটু গেড়ে বসে গুলি করবেন।”

এই বক্তব্য আদালতে উঠতেই ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হন।
সাক্ষী ব্যাখ্যা করেন, এ ধরনের শুটিং পজিশন সাধারণত লক্ষ্যবস্তুতে আরও নিখুঁতভাবে গুলি লাগানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।

আরেকজন পুলিশ সদস্য জানান, “অনেকেই গুলির নির্দেশ মানতে চাননি। কেউ কেউ বলেছিলেন—এভাবে গুলি চালানো ঠিক হচ্ছে না।”
কিন্তু নির্দেশটি ছিল অত্যন্ত কঠোর, ফলে মাটিতে অবস্থান নেওয়া বাহিনীর কয়েকজন সদস্যও গুলি চালাতে বাধ্য হন বলে তিনি দাবি করেন।


গুলিতে নিহত ও আহত হওয়ার তথ্য আসে আদালতে

সাক্ষ্য অনুযায়ী—

  • রামপুরা এলাকায় দুই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

  • একজন শিশু গুলিতে আহত হয়, তার হাতে মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়।

কিছু পুলিশ সদস্য স্বীকার করেছেন—
নির্দেশ কার্যকর হওয়ার পরপরই একাধিক ভিকটিমকে আহত অবস্থায় তারা নিজেরাই হাসপাতালে পাঠান।


নির্দেশ মানায় পুরস্কার পাওয়ার অভিযোগ

একজন সাক্ষী আরও বলেন—
রামপুরা থানার ওসিকে কমিশনার পরবর্তীতে নগদ পুরস্কার দেন, কারণ তিনি “অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করেছেন।”

এই বক্তব্য আদালতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
প্রসিকিউশন বলে—এ ধরনের পুরস্কার দেখায় যে অভিযান পূর্বপরিকল্পিত ছিল এবং গুলিবর্ষণ ছিল “স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া” নয়, বরং অনুমোদিত অপারেশন।


প্রতিরক্ষা পক্ষ বলছে—গুজব, বিকৃত সাক্ষ্য

ডিএমপির সাবেক কমিশনারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে—

  • তিনি কখনোই নির্বিচারে গুলির নির্দেশ দেননি,

  • গুলির নির্দেশ ছিল “জরুরি পরিস্থিতিতে জানমাল রক্ষার অংশ”,

  • আর সেদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক নাশকতার ঘটনা ঘটছিল।

তারা আরও বলেন,
সাক্ষ্যপ্রমাণের অনেক অংশই “ওয়ারলেস সংকেত ভুল ব্যাখ্যার ফল” এবং “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো বক্তব্য।”


ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ

ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছে—

  • সাক্ষ্য, বেতার রেকর্ড, ভিডিও ফুটেজ, সিডিআরসহ সব প্রমাণ যাচাই চলছে,

  • এখনই কোনো মন্তব্য করা হচ্ছে না,

  • এবং আদালত শুধু প্রমাণ দেখে সিদ্ধান্ত দেবে।

সাম্প্রতিক শুনানিতে প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়,
“১৭ জুলাই সরকারি ছুটি ছিল, শহরে এমন কোনো পরিস্থিতি ছিল না যেটিকে ‘অবিলম্বে গুলির প্রয়োজন’ বলে ঘোষণা করা যায়।”


ঘটনার গুরুত্ব কেন এত বেশি

এই মামলার প্রভাব গভীর কারণ—

  • একজন নগরীর সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি গুলির নির্দেশ দিয়েছেন কিনা,

  • নির্দেশটি আইনসঙ্গত ছিল কিনা,

  • এবং সেই নির্দেশে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে কিনা—

এসব প্রশ্ন শুধু বিচারালয় নয়, জনমত, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং মানবাধিকার নীতিমালাকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে।


উপসংহার

ডিএমপি কমিশনারের গুলির নির্দেশ সংক্রান্ত সাক্ষ্য আদালতে যে চিত্র তুলে ধরছে, তা অত্যন্ত গুরুতর।
সর্বোচ্চ বল প্রয়োগ, নির্দিষ্ট শুটিং পজিশন নির্দেশ, পুরস্কারের অভিযোগ—সবকিছুই ইঙ্গিত করছে যে সেই সময়ের অভিযান ছিল কঠোর, শক্তিশালী এবং কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন।

তবে—
রায় ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত আদালত কারো বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।
প্রমাণ যাচাইয়ের পরই চূড়ান্ত রায়ে নির্ধারিত হবে—নির্দেশটি আইনসঙ্গত ছিল নাকি অপরাধমূলক।



Post a Comment

Previous Post Next Post

Blog Archive

kaler khota, কালের কথা, নিউজ, news