হাইওয়েতে ব্যাপক চাঁদাবাজি: সড়ক ব্যবস্থার অন্ধকার মুখ ও জনজীবনের ক্ষয়ের গল্প
বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো দেশের বাণিজ্য, পরিবহন ও জনগতির প্রধান স্রোতধারা। এক জেলা থেকে আরেক জেলা, বন্দর থেকে কারখানা, কৃষক থেকে পাইকার—সব লেনদেনের মূল পথ হলো এই হাইওয়ে নেটওয়ার্ক। বলা যায়, জাতির অর্থনীতি অনেকাংশেই দাঁড়িয়ে আছে সড়কপথের ওপর। কিন্তু এই জীবনরেখায় বহুদিন ধরে একটি অবৈধ প্রবাহ গড়ে উঠছে—চাঁদাবাজি। দিনের আলো হোক কিংবা গভীর রাত, রাস্তায় স্টপেজ হোক বা নির্জন সেতুর মাথা—নানা সময়ে, নানা ছলে এক ধরনের আধা-সংগঠিত চাঁদাবাজির প্রথা তৈরি হয়ে গেছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু চালক-ব্যবসায়ী নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি ও জনজীবন।
■ কীভাবে চাঁদাবাজি সংঘটিত হয়
হাইওয়ের পথে যাত্রা করা কোনো ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান বা বাস এগোলে পথের মাঝে নানা জায়গায় বাধার মুখোমুখি হতে পারে। কখনো সেটি হয় চেকপোস্টের নামে, কখনো শ্রমিক সংগঠনের টোল স্টপে, আবার কখনো নির্দিষ্ট গ্রুপ গাড়ি থামিয়ে টাকা দাবি করে। সাধারণত, চাঁদা আদায় করা হয় এভাবে—
-
গাড়ি আটকে হুমকি দেওয়া হয়
কাগজপত্র ঠিক থাকলেও বলা হয়—“ডকুমেন্টে সমস্যা আছে”, “লাইসেন্স যাচাই করতে হবে”, “রাতের পথে নিরাপত্তা ফি লাগবে” ইত্যাদি অজুহাতে গাড়ি থামানো হয়। -
প্রতি পয়েন্টে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা
অনেক রুটে চালকদের অভিযোগ, একেক জায়গায় ২০০–৫০০ টাকা করে দিলেও পুরো যাত্রায় এক ট্রাক থেকে কয়েক হাজার টাকা গায়েব হয়ে যায়। -
না দিলে হয়রানি
টাকা দিতে অস্বীকার বা দেরি হলে মাল নেমে নেওয়া, গাড়ি আটকে রাখা, মামলা বা জব্দের ভয় দেখানো, এমনকি শারীরিকভাবে ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও শোনা যায়।
এই অবস্থায় চালকেরা প্রায়ই বলেন—চাঁদা দেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কারণ তারা পরিবহন নিয়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে চান; ঝামেলায় জড়ালে সময়, আর্থিক ক্ষতি, এমনকি মালামালের ভাড়াটিয়ার সঙ্গে চুক্তি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও অনেকে প্রতিবাদ করেন না।
■ কারা এই চক্রের সাথে জড়িত—অভিযোগ ও বাস্তবতা
হাইওয়ে চাঁদাবাজি সাধারণত একক ব্যক্তির কাজ নয়। বরং এটি গড়ে ওঠে একটি নেটওয়ার্ক—যেখানে বিভিন্ন স্তরের লোকজন ছড়িয়ে থাকে। তাদের মধ্যে থাকতে পারে—
-
পরিবহন শ্রমিক সংগঠনের অসৎ অংশ
-
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী
-
টোল ইজারাদার বা মধ্যস্বত্বভোগী
-
কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সদস্য
তবে লক্ষ্য রাখতে হবে—সবাই জড়িত নয়। অনেক কর্মকর্তা ও সংগঠন চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কাজ করছেনও। কিন্তু দুর্বল শৃঙ্খলা ব্যবস্থা কখনো কখনো অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি সমাধানহীন রয়ে গেছে।
■ অর্থনীতি ও জনজীবনে চাঁদাবাজির বহুমাত্রিক প্রভাব
হাইওয়ে চাঁদাবাজির ক্ষতি শুধু রাস্তার ধারেই থেমে থাকে না, এর ঢেউ গিয়ে আঘাত করে বাজার, ব্যবসা, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়।
১) পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি
যখন ট্রাক মালিক বা চালক অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য হন, সেই ব্যয় তারা বহন করেন না। তা যোগ হয় পরিবহন খরচে, আর শেষে এসে পড়ে পণ্যের বিক্রয় মূল্যে। ফলাফল—বাজারে দ্রব্যমূল্য বেড়ে যায়, ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২) কৃষি-পণ্য পরিবহনে বড় ধাক্কা
গ্রাম থেকে শহরে আসা সবজি, মাছ, ধান, ডাল—সবকিছুই ট্রাক বা পিকআপে আসে। পথেযদি পাঁচ–ছয় জায়গায় চাঁদা দিতে হয়, কৃষকের লাভ কমে যায়, আর শহরে দাম বাড়ে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষির ন্যায্য প্রাপ্তি বিঘ্নিত হয়।
৩) ব্যবসায়ী ও লজিস্টিক খাত সংকটে
দ্রুত ডেলিভারি প্রয়োজনীয় মালামাল—যেমন রপ্তানির পোশাক, কাঁচামাল, ই-কমার্স পণ্য—রাস্তায় দেরি হলে ক্ষতি হয় কোটি টাকার। অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠানও বিনিয়োগে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে।
৪) জাতীয় প্রতিযোগিতা ক্ষমতা কমে যায়
একটি দেশের রাস্তা যত দুর্নীতিমুক্ত ও সহজলভ্য, তার অর্থনীতি তত দ্রুত এগোয়। অবৈধ অর্থ আদায় বাংলাদেশকে সেই গতির পথে বাধা দেয়।
■ কেন বন্ধ হচ্ছে না—মূল বাধাগুলো
হাইওয়েতে চাঁদাবাজি বন্ধ না হওয়ার কয়েকটি প্রধান কারণ আছে—
-
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দিতে ভয়
চালকেরা বলেন—আজ অভিযোগ করলে কাল রাতে চলতে পারবেন তো? নিরাপত্তাহীনতা তাদের নীরব করে রাখে। -
দুর্নীতির নেটওয়ার্ক শক্তিশালী
একাধিক স্তর যুক্ত থাকলে কাউকে ধরলে আরেকজন আবার সিস্টেম চালু রাখে। -
ডাটাবেস ও নজরদারি ব্যবস্থা দুর্বল
প্রতিটি চেক-পয়েন্ট মনিটরিং, ক্যামেরা সংযোগ বা স্বয়ংক্রিয় রেকর্ড না থাকায় প্রমাণ রাখা কঠিন হয়। -
ট্রান্সপোর্ট মালিক ও শ্রমিকের স্বার্থ দ্বন্দ্ব
মালিক সস্তায় চলতে চান, শ্রমিক টোল চাই—এই দ্বন্দ্বও চাঁদার সুযোগ তৈরি করে।
■ সমাধান কীভাবে সম্ভব—বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা
চাঁদাবাজি বন্ধ করা অসম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ—
🔹 ১) হাইওয়ে নজরদারি ডিজিটালাইজেশন
প্রত্যেক চেক-পোস্টে ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় রেকর্ডিং বাধ্যতামূলক করা গেলে কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। গাড়ি থামানোর সময়, কথা, লেনদেন—সবই প্রমাণ হয়ে থাকবে।
🔹 ২) চালকদের জন্য নিরাপদ অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম
হটলাইন + মোবাইল অ্যাপ + তাৎক্ষণিক রেসপন্স টিম গঠন করা হলে চালক ভয় পেয়েও অভিযোগ করতে পারবে।
🔹 ৩) টোল সিস্টেমে স্বচ্ছতা
যেখানে সরকারি টোল আছে সেখানে ডিজিটাল রসিদ বাধ্যতামূলক হওয়া জরুরি। ইজারা ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে তা সময়মতো বাতিল করা উচিত।
🔹 ৪) ভ্রাম্যমাণ আদালত ও কঠোর শাস্তি
ধরা পড়লে শুধু জরিমানা নয়, লাইসেন্স স্থগিত, চাকরি বাতিল এবং প্রকাশ্য জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া দরকার।
🔹 ৫) পরিবহন শ্রমিকদের সঠিক মজুরি ও বিকল্প উৎস
শ্রমিক যদি প্রকৃত আয় পায়, তবে চাঁদাবাজির ওপর নির্ভরতা কমবে। অর্থনৈতিক রিফর্মও দরকার।
■ শেষ কথা
হাইওয়েতে চাঁদাবাজি শুধু অবৈধ আয়ের উৎস নয়—এটি দেশের পরিবহন ব্যবস্থার রক্তক্ষরণ। এর কাছে জিম্মি হয়ে আছে চালক, ব্যবসায়ী, কৃষক এবং সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন হাজার গাড়ি চলে, লক্ষ টাকার পণ্য আসে-যায়, কিন্তু পথের ধাপে ধাপে গায়েব হয় কোটি টাকা। এই অব্যাহত চক্র আমাদের উন্নয়নকে ছায়াময় করে রাখে।
আইন কঠোর হলে, প্রযুক্তি প্রয়োগ হলে, নাগরিক ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা তৈরি হলে—এই দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব। সড়ক যদি নিরাপদ, দুর্নীতিমুক্ত ও দ্রুতগতিসম্পন্ন হয়, তবে বাংলাদেশও অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তাই এখন সময় অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালানোর—হাইওয়েকে ফিরিয়ে দিতে তার স্বাভাবিক গতি।
