এনসিপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে শুরুতেই থেমে যাচ্ছে ‘তৃতীয় শক্তির’ যাত্রা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে দুই প্রধান ধারার প্রভাব স্পষ্ট—একদিকে ক্ষমতাসীন দল, অন্যদিকে বৃহৎ বিরোধী ঘরানা। এই দুই কেন্দ্রের বাইরে এসে নতুন একটি রাজনৈতিক বিকল্প তৈরির লক্ষ্যে যে সব প্রচেষ্টা অতীতে দেখা গেছে, বেশিরভাগই টেকসই রূপ নিতে পারেনি। সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের উদ্যোগে “তৃতীয় শক্তি” গঠনের প্রস্তুতি ঘোষণা করলে রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম নেয়। কিন্তু শুরুতেই দলের অভ্যন্তরে দেখা দেওয়া মতবিরোধ পুরো পরিকল্পনাকে ধীর করে দিয়েছে।
শুরুতে এনসিপি নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েছিল—তারা জাতীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে মাঠে নামতে চায়। কথাবার্তা ছিল সম্ভাব্য নতুন জোট, প্রগতিশীল ও বিকল্পমুখী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, এমনকি নির্বাচনী আসনভিত্তিক প্রার্থী দাঁড় করানোর পরিকল্পনাও। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশে দুইধারার বাইরে নতুন একটি রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরি হতে পারত।
কিন্তু সেই পথ এতটা মসৃণ হয়নি। জোট গঠন নিয়ে দলের ভেতরেই দেখা দিয়েছে মতবিরোধ। কার সঙ্গে জোট হবে, কোন দলকে যুক্ত করা হবে, আদর্শগত অবস্থান কী হবে—এসব প্রশ্নে নেতা–কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিভাজন। কেউ কেউ জোট বিস্তারে আগ্রহী হলেও অন্যরা মনে করছেন তাড়াহুড়ো করে জোট করলে এনসিপির নিজস্ব পরিচয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই মতপার্থক্য ধীরে ধীরে তর্ক-বিতর্কে পরিণত হয় এবং অবশেষে দলীয় সভা ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
পরিস্থিতির কারণে তৃতীয় শক্তি ঘোষণা বা জোট গঠনের পদক্ষেপ আপাতত স্থগিত বলে মনে হচ্ছে। যে উদ্যোগটিকে সামনে রেখে বড় পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা এখন নতুন করে চিন্তাবিনিময় ও সমন্বয়ের অপেক্ষায়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি দলীয় কাঠামো ও নেতৃত্বের সমন্বয় পুনরায় শক্তিশালী করা যায়, তাহলে এই উদ্যোগ আবারও গতি পেতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন—এই বাস্তবতা এনসিপিকে স্বীকার করতেই হবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি বা বিকল্প ধারার প্রয়োজন ও চাহিদা অনেকদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তা বাস্তবে কার্যকর হয় না—প্রস্তুতি, সংহতি ও স্থির নেতৃত্ব ছাড়া সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। এনসিপির বর্তমান পরিস্থিতি সেই সত্যকেই আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। এখন দেশ দেখছে—দলটি কি দ্রুতই সংকট কাটিয়ে নতুন পথ খুঁজে নেয়, নাকি এই উদ্যোগও অতীতের বহু প্রয়াসের মতো ইতিহাসে হারিয়ে যাবে।
