মেয়েদের মাসিক কখন শুরু হয় — কারণ, লক্ষণ, সময়, শারীরিক পরিবর্তন ও মানসিক দিক
মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো মাসিক বা ঋতুস্রাব। এটি সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালের একটি অংশ হিসেবে শুরু হয় এবং একটি মেয়ের শারীরিক সক্ষমতা, হরমোনের পরিপক্বতা ও বিভিন্ন জৈবিক পরিবর্তনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। সাধারণভাবে বলতে গেলে, মেয়েদের শরীরে ডিম্বাশয় (ovary) থেকে ডিম পরিপক্ব হওয়া এবং জরায়ুর অভ্যন্তরীণ পর্দা গঠন হওয়ার ফলে মাসিক হয়। কিন্তু এটি কোন সময়ে শুরু হবে—এটি প্রতিটি মেয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। নিচে পুরো বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
মাসিক সাধারণত কোন বয়সে শুরু হয়?
বিশ্বব্যাপী গবেষণা অনুযায়ী মেয়েদের মাসিক শুরু হওয়ার স্বাভাবিক বয়স সাধারণত—
-
৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে
-
গড় বয়স ১০–১৩ বছর
কেউ কেউ ৮–৯ বছরেই শুরু করতে পারে, আবার কেউ ১৬ বছরেও শুরু নাও করতে পারে।
এই ভিন্নতার পেছনে জিনগত (genetic), খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক গঠন, পরিবেশ, হরমোন ও পারিবারিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যে লক্ষণগুলো দেখা দিলে বোঝা যায় মাসিক শুরু হওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে
মাসিক শুরু হওয়ার আগে মেয়েদের শরীরে যে পরিবর্তনগুলো দেখা যায়—
১. স্তন বিকাশ শুরু (Breast budding)
সাধারণত ৮–১৩ বছরের মধ্যে বুকে সামান্য ফোলাভাব বা ব্যথা অনুভূত হতে পারে। এটি মাসিকের প্রথম সংকেত।
২. লোম গজানো
যোনি ও বগলের নিচে লোম বাড়তে শুরু করে। সাধারণত স্তন বিকাশের ১–১.৫ বছর পর এই পরিবর্তন হয়।
৩. শরীরের গঠন পরিবর্তন
-
কোমর চওড়া হওয়া
-
নিতম্বে মাংসপেশি ও চর্বি জমা
-
ওজন বৃদ্ধি
এগুলো প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রস্তুতি।
৪. সাদা স্রাব (Vaginal discharge)
মাসিক শুরু হওয়ার আগে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
হালকা সাদা, দুধের মতো বা স্বচ্ছ তরল বের হওয়া স্বাভাবিক এবং এটি মাসিকের ৬–১২ মাস আগে শুরু হতে পারে।
যে বয়সে মাসিক দেরি হচ্ছে ধরে নেওয়া হয়
-
১৫–১৬ বছরের পরেও মাসিক শুরু না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এর পেছনে হরমোন সমস্যা, অপুষ্টি, মানসিক চাপ বা জন্মগত কোনো শারীরিক গঠনের সমস্যা থাকতে পারে।
মাসিক কেন হয় — সহজ ব্যাখ্যা
মেয়েদের শরীরে প্রতি মাসে—
-
ডিম্বাশয় একটি ডিম তৈরি করে।
-
জরায়ুর ভেতরে রক্ত ও টিস্যুর একটি নরম আস্তরণ তৈরি হয়।
-
যদি গর্ভধারণ না ঘটে, এই আস্তরণ বের হয়ে যায়—এটাই মাসিক।
মাসিক মূলত শরীরের একটি স্বাভাবিক চক্র, যা সাধারণত ২৮–৩০ দিন পরপর ঘটে, তবে ২১–৩৫ দিনের মধ্যেও হতে পারে।
মাসিক কতদিন স্থায়ী হয়?
সাধারণত—
-
৩–৭ দিন
-
কেউ কেউ ২ দিনেও শেষ হতে পারে, আবার কারো ৮ দিনও চলতে পারে।
শুরুতে কয়েক মাস অনিয়মিতা (irregular) থাকাই স্বাভাবিক।
শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন
মাসিকের সময় মেয়েদের শরীরে হরমোন ওঠানামা হয়। ফলে কিছু পরিবর্তন অনুভূত হতে পারে—
শারীরিক পরিবর্তন
-
পেট ব্যথা বা ক্র্যাম্প
-
কোমর ব্যথা
-
স্তনে টান ধরে
-
দুর্বলতা
-
মাথা ব্যথা
-
ক্লান্তি
এসব সাধারণত স্বাভাবিক এবং সময়ের সাথে কমে যায়।
মানসিক পরিবর্তন
-
মুড পরিবর্তন
-
খিটখিটে ভাব
-
দুঃখ বা চাপ
-
একাকীত্ব বোধ
এগুলোও হরমোনজনিত এবং অস্থায়ী।
মাসিক শুরু হওয়ার পর কোন বিষয়গুলো জানা জরুরি
১. চক্র (Cycle) নিয়মিত রাখা
প্রথম থেকে প্রতিটি মাসিকের তারিখ নোট করা ভালো। এতে চক্রের হিসাব জানা যায়।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
-
স্যানিটারি ন্যাপকিন ৪–৬ ঘণ্টা পরপর বদলানো
-
সাবান ও পানি দিয়ে প্রস্রাবের জায়গা ধোয়া
-
ভেজা কাপড় ব্যবহার না করা
স্বাস্থ্যকর অভ্যাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়।
৩. সুষম খাদ্য খাওয়া
মাসিকের সময় রক্তক্ষরণের কারণে শরীর দুর্বল হতে পারে। তাই—
-
পানি
-
ফল
-
সবজি
-
রক্ত বৃদ্ধিকারী খাবার
খাওয়া উচিত।
৪. ব্যথা কমানোর উপায়
-
হালকা গরম সেঁক
-
সামান্য ব্যায়াম
-
বিশ্রাম
-
পুষ্টিকর খাবার
এসব ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
মাসিক দেরি হওয়ার কিছু সাধারণ কারণ
-
মানসিক চাপ
-
অত্যধিক ব্যায়াম
-
অতিরিক্ত ওজন কমে যাওয়া
-
অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া
-
হরমোনের অসামঞ্জস্য
-
থাইরয়েড সমস্যা
এগুলো হলে চক্র সাময়িকভাবে বিশৃঙ্খল হতে পারে।
মাসিক নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা জরুরি
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে মাসিক নিয়ে লজ্জা, ভয় ও ভুল ধারণা রয়েছে। কিন্তু এটি খুবই স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। মাসিক হওয়া মানে—
-
মেয়ে শারীরিকভাবে বড় হচ্ছে
-
হরমোন স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে
-
ভবিষ্যতে মা হওয়ার সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে
এটি কোনো রোগ, দোষ বা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
কখন চিকিৎসকের সাথে কথা বলা উচিত
নিম্ন অবস্থাগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন—
-
১৫–১৬ বছরেও মাসিক না হওয়া
-
অতিরিক্ত রক্তপাত
-
৭ দিনের বেশি স্থায়ী মাসিক
-
তীব্র ব্যথা, চলাফেরা কঠিন
-
প্রথম ২–৩ বছর পরও মাসিক খুব অনিয়মিত থাকা
-
দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা জ্বালা
চিকিৎসা নিলে সমস্যাগুলো সহজেই সমাধান করা যায়।
শেষ কথা
মেয়েদের মাসিক সাধারণত ৯ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে শুরু হয়। কেউ আগে, কেউ পরে শুরু করলে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক। শরীরের প্রস্তুতি, হরমোনের ভারসাম্য, খাদ্যাভ্যাস, পরিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। মাসিক নিয়ে ভয় বা লজ্জার কিছু নেই—এটি প্রকৃতির একটি সুন্দর, স্বাভাবিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।
যদি তুমি স্বাস্থ্য, হায়েয, বালেগ হওয়া, সাদা স্রাব, পিরিয়ডের সমস্যা বা অন্য কোনো বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চাও, আমাকে বলতে পারো।
.jpg)