ভারতের রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এক মাওলানা



🕌 মাওলানা আবুল কালাম আজাদ : এক আলোকিত জীবনের কাহিনি

🌿 জন্ম ও পরিবার

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৮৮৮ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা খায়েরউদ্দিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলেম ও সুফি চিন্তাবিদ, আর মা ছিলেন আরব বংশোদ্ভূত এক ধর্মপ্রাণ নারী। ছোটবেলায় তিনি পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে আসেন এবং কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।


📚 শিক্ষা ও প্রারম্ভিক জীবন

আজাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব অল্প সময়ের হলেও তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত এক মেধাবী মানুষ। আরবি, ফার্সি, উর্দু ও ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জন করেন।
শৈশব থেকেই ইসলামি শিক্ষা, দর্শন, ইতিহাস ও সাহিত্য অধ্যয়নে গভীর আগ্রহ দেখান। তরুণ বয়সেই তিনি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন — তাঁর সম্পাদিত আল-হিলালআল-বালাগ পত্রিকা উপমহাদেশে মুসলিম জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে।


🇮🇳 রাজনীতিতে প্রবেশ

২০ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আন্দোলনে তিনি যোগ দেন।
তিনি ছিলেন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (INC) অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং মহাত্মা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধারণা তিনি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করতেন এবং মুসলিম লিগের বিভাজন নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেন।

১৯২৩ সালে মাত্র ৩৫ বছর বয়সে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন — যা ছিল দলের ইতিহাসে অন্যতম কনিষ্ঠ সভাপতি।


✊ স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা

  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় একাধিকবার তিনি কারাবরণ করেন।

  • ১৯৪২ সালের “ভারত ছাড়ো আন্দোলনে” (Quit India Movement) তিনি অন্যতম নেতৃত্ব দেন।

  • তাঁর বক্তৃতা ও লেখায় সর্বদা ছিল ঐক্য, শান্তি ও মানবতার বার্তা।

আজাদ বিশ্বাস করতেন — “ভারত শুধুই হিন্দু বা মুসলমানদের দেশ নয়, এটি সবার। ধর্ম নয়, মানবতাই আমাদের আসল পরিচয়।”


🏫 স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৪৭ সালে তাঁকে দেশের প্রথম শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় —

  • ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC)

  • ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (IIT)

  • সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক একাডেমি (সাহিত্য একাডেমি, ললিতকলা একাডেমি)

তিনি শিক্ষাকে জাতির ভিত্তি হিসেবে দেখতেন এবং গ্রামীণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।


✍️ সাহিত্য ও চিন্তাধারা

আজাদ শুধু রাজনীতিকই নন, ছিলেন একজন চিন্তাবিদ ও লেখকও।
তাঁর বিখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে আছে —

  • “ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম” (India Wins Freedom)

  • “গুবার-এ-খাতির” (Ghubar-e-Khatir)

এই লেখাগুলোয় দেখা যায় তাঁর গভীর ধর্মীয় চিন্তা, মানবতাবাদ ও সামাজিক সংস্কারের আহ্বান।


⚖️ আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি

  • ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতিগত ঐক্যের প্রবল সমর্থক ছিলেন।

  • শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজের উন্নয়নই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

  • তিনি বলতেন:

    “জাতি তখনই টিকে থাকে, যখন তার তরুণরা বই হাতে নেয়, অস্ত্র নয়।”


🕊️ মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯৫৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন।
মৃত্যুর পর ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে তাঁর সমাধি নির্মিত হয় — “আযাদ মেমোরিয়াল” নামে এটি এখন ঐতিহাসিক নিদর্শন।

তাঁর জন্মদিন ১১ নভেম্বর ভারতে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” (National Education Day) হিসেবে পালন করা হয়।


🌟 উপসংহার

মাওলানা আজাদ ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞানে গভীর, রাজনীতিতে দূরদর্শী এবং শিক্ষায় অনন্য এক ব্যক্তিত্ব।
তিনি প্রমাণ করেছিলেন—

“সত্যিকারের আলেম শুধু ধর্ম শেখায় না, সমাজকে আলোকিতও করে।”

ভারতের ইতিহাসে তাঁর নাম থাকবে একজন মাওলানা, যিনি রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়িয়ে শিক্ষা, ঐক্য ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে গেছেন চিরকাল।



Post a Comment

Previous Post Next Post

Blog Archive

kaler khota, কালের কথা, নিউজ, news